নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত বিক্রমপুর স্টিল মিলস যেন ক্রমেই পরিণত হচ্ছে এক মৃত্যুকূপে।
মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে একই কারখানায় লোহা গলানোর ভাট্টি বিস্ফোরণে একাধিক শ্রমিক দগ্ধ ও নিহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে—এটি কোনো “দুর্ঘটনা” নয়, বরং ধারাবাহিক অবহেলা ও চরম দায়িত্বহীনতার ফল।
গত বছরের ২৫ জুলাই ভোরে ভুলতা ইউনিয়নের বিক্রমপুর স্টিল লিমিটেডে ভাট্টি বিস্ফোরণে তিন শ্রমিক গুরুতর দগ্ধ হন।
তখনই প্রশ্ন উঠেছিল—কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আদৌ আছে কি না। কিন্তু সেই প্রশ্নের কোনো কার্যকর জবাব না দিয়েই কর্তৃপক্ষ সময় পার করেছে।
ফলাফল, ছয় মাস না যেতেই আবারও একই চিত্র।
আজ মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) অর্থাৎ সোমবার দিবাগত রাত ২টায় রূপগঞ্জের মৈকুলী এলাকায় অবস্থিত একই প্রতিষ্ঠানে ফের ভাট্টি বিস্ফোরণ।
এতে আলম হোসেন নামে এক শ্রমিক প্রাণ হারান এবং বরকত নামের আরেক শ্রমিক আশঙ্কাজনক অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
এটি স্পষ্ট যে, আগের ঘটনার পর কোনো তদন্তের বাস্তব প্রতিফলন হয়নি, হয়নি নিরাপত্তা সংস্কার, হয়নি দায়ীদের জবাবদিহি।
প্রশ্ন উঠছে—কর্তৃপক্ষ কোথায় ?
একই কারখানায় একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মালিকপক্ষ কার্যত নির্বিকার।
শিল্পকারখানার নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে থাকা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE), স্থানীয় প্রশাসন কিংবা শিল্প মালিক সমিতির কোনো দৃশ্যমান কঠোর ভূমিকা চোখে পড়ছে না। শ্রমিকরা যেন পরীক্ষাগারের গিনিপিগ—আজ বাঁচলে কাল মরবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
শ্রমিক কি কেবলই সংখ্যামাত্র ?
এই কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের জন্য যথাযথ সেফটি গিয়ার, আধুনিক ভাট্টি প্রযুক্তি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার ঘাটতি পুরোনো অভিযোগ। কিন্তু প্রতিবারই ঘটনার পর দায়সারা বক্তব্য আর “আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন” কথাটিই যেন চূড়ান্ত আশ্বাস।
বাস্তবে দোষীরা থেকে যায় আড়ালে, আর নিহত শ্রমিকের পরিবার পড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে।
দুর্ঘটনা নয়, এটি কাঠামোগত ব্যর্থতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার ভাট্টি বিস্ফোরণ প্রমাণ করে—কারখানার যন্ত্রপাতি পুরোনো, নিরাপত্তা মান লঙ্ঘিত এবং শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ অপ্রতুল। তবু মুনাফার লোভে উৎপাদন বন্ধ না করে ঝুঁকিপূর্ণ ভাট্টিতেই কাজ চালানো হচ্ছে। এটি সরাসরি শ্রমিকের জীবনের সঙ্গে নিষ্ঠুর তামাশা।
এখনই জবাবদিহি দরকার
# এই ঘটনায় কেবল একটি মামলা বা তদন্ত
# কমিটি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন—
# স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত
# কারখানা মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ
# ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানায় নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি
নচেৎ আজ আলম হোসেন, কাল হয়তো আরেকটি নাম যোগ হবে তালিকায়। প্রশ্ন থেকেই যায়—আর কত শ্রমিকের মৃত্যু হলে কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙবে ?









Discussion about this post