নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে চূড়ান্তভাবে ৪৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলেও বিস্ময়কর ও লজ্জাজনকভাবে একজন নারী প্রার্থীও নেই। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর জেলা নারায়ণগঞ্জে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীদের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্নের ঝড়।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানান, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর পাঁচটি আসনে মোট ৪৭ জন প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছেন। বুধবার তাদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং এরপর আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হবে।
কিন্তু প্রতীক যাই হোক, এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় “প্রতীক” হয়ে দাঁড়িয়েছে—নারী শূন্যতা।
পাঁচ আসনে পুরুষদের একচেটিয়া দখল
চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী—
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) : ৭ জন
বিএনপির প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, স্বতন্ত্র মো. দুলাল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আনোয়ার হোসেন মোল্লা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. ইমদাদুল্লাহ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মনিরুজ্জামান চন্দন, গণঅধিকার পরিষদের ওয়াসিম উদ্দিন ও ইনসানিয়াত বিপ্লব, বাংলাদেশের মো. রেহান আফজাল। এ আসনে মো. দুলাল যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার): ৬ জন
বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ, স্বতন্ত্র আতাউর রহমান আঙ্গুর, সিপিবির হাফিজুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর ইলিয়াস মোল্লা, গণঅধিকার পরিষদের কামরুল মিয়া ও ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মো. হাবিবুলল্লাহ ।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ): ১১ জন
সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ১১ জন প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছেন। তারা হলেন- বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান, স্বতন্ত্র মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম, জামায়াতে ইসলামীর ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, গণসংহতি আন্দোলনের অঞ্জন দাস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী, ইসলামী আন্দোলনের গোলাম মসীহ, জনতার দলের আবদুল করিম মুন্সী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. শাহজাহান, আমার বাংলাদেশ পার্টির আরিফুল ইসলাম ও গণঅধিকার পরিষদের মো. ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী। এসব প্রার্থীর মধ্যে গিয়াস উদ্দিন বিএনপির সংসদ সদস্য এবং অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বিএনপির প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সদর অংশ): ১৩ জন
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমী, স্বতন্ত্র মো. শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মোহাম্মদ আলী, জাতীয় নাগরিক পার্টির অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি ইসমাইল কাউসার, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সেলিম মাহমুদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আনোয়ার হোসেন ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের মো. সুলাইমান দেওয়ান, সিপিবির ইকবাল হোসেন ও গণঅধিকার পরিষদের আরিফ ভূঁইয়া, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সেলিম আহমেদ, জাতীয় পার্টির সালাউদ্দিন খোকা মোল্লা।
নারায়ণগঞ্জ-৫ (সিটি করপোরেশন ও বন্দর): ১০ জন
বিএনপির অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, স্বতন্ত্র মাকসুদ হোসেন, গণসংহতি আন্দোলনের তারিকুল ইসলাম সুজন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সৈয়দ বাহাদুর শাহ মুজাদ্দেদী, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি মাছুম বিল্লাহ, খেলাফত মজলিসের এবিএম সিরাজুল মামুন, বাসদের আবু নাঈম খান বিপ্লব, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের এইচএম আমজাদ হোসেন মোল্লা ও সিপিবির মন্টু চন্দ্র ঘোষ, গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী নাহিদ হোসেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি ছিলেন।
এই ৪৭ জনের মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, সিপিবি, বাসদ, গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফত মজলিসসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থী থাকলেও একজন নারীও মনোনয়ন পাননি বা দাঁড়াননি—যা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সব বুলি ও প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রশ্নের মুখে রাজনৈতিক দলগুলো
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি নিছক কাকতাল নয়; বরং দলীয় নেতৃত্বের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার নগ্ন প্রকাশ। নারায়ণগঞ্জে নারী ভোটার সংখ্যা প্রায় পুরুষের সমান হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীদের একেবারেই অনুপস্থিত রাখা হয়েছে।
নারী নেত্রীদের “যোগ্যতা নেই”—এই অঘোষিত অজুহাত কি তবে এখনো বহাল? নাকি নিরাপদ আসনে নারী প্রার্থী না দেওয়ার অলিখিত সংস্কৃতি আজও ভাঙা যায়নি ?
উন্নয়ন, প্রতিনিধিত্ব ও বাস্তবতার ভয়াবহ ফাঁক
একদিকে নারী অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে জাতীয় সংসদে যাওয়ার লড়াইয়ে নারীদের সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হচ্ছে। এতে স্পষ্ট হয়—নারী প্রতিনিধিত্ব এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রচারমূলক স্লোগানের বেশি কিছু নয়।
নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় একজন নারী প্রার্থীও না থাকা শুধু হতাশাজনক নয়, এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি অশনিসংকেত।
সমালোচনার ঝড়, জবাব নেই
ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বড় রাজনৈতিক দলই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা আত্মসমালোচনায় যায়নি।
নারায়ণগঞ্জের এই নির্বাচন প্রমাণ করে দিয়েছে—
নারী ছাড়া রাজনীতি চলছে, কিন্তু নারীর জন্য রাজনীতি এখনো প্রস্তুত নয়।
প্রশ্ন রয়ে যায়—
👉 নারীরা কি শুধু ভোটার, প্রার্থী নন ?
👉 নাকি নারায়ণগঞ্জে রাজনীতি মানেই এখনো পুরুষদের একচেটিয়া মাঠ ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে, নির্বাচন যতই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হোক—তা গণতান্ত্রিক পূর্ণতা পাবে না।









Discussion about this post