নিজস্ব প্রতিবেদক | নারায়ণগঞ্জ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সম্ভাব্য গণভোটকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, রূপগঞ্জের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও যুবলীগ নেতা তারিকুল ইসলাম মোঘল পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বানচালের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এক সময়ের একেবারে নিঃস্ব তরিকুল ইসলাম মোগলের পিতা ছিলেন একটি মিলের সামান্য কর্মচারী। বসবাস করতেন সরকারি খাস জমিতে। নুন আনতে পান্তা ফুরানো এ পরিবারটি আওয়ামী লীগের সরকারের শাসনামলে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন ভূমিদস্যুতা, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, অস্ত্র ব্যবসা, মাদকের বিশাল পাইকারি চালান আমদানিসহ সকল ধরনের অপরাধ করে।
এ লক্ষ্যে তিনি আওয়ামী লীগ আমলে নিজ হাতে গড়ে তোলা সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীকে আবার সক্রিয় করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানায়, প্রায় আড়াই শতাধিক প্রশিক্ষিত সশস্ত্র ক্যাডার নিয়ে গঠিত এই বাহিনী অতীতে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পাশাপাশি জমি দখল, চাঁদাবাজি, জুয়া, ক্যাসিনো, মাদক ও দেহ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমানে তাদের আবার সংগঠিত করে নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পলাতক নেতাদের নির্দেশে মাঠ গরমের ছক ?
স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, সম্প্রতি দেশে ফেরার পর মোঘল ঢাকায় আত্মগোপনে থেকে আওয়ামী লীগের পলাতক শীর্ষ কয়েকজন নেতার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচন বানচাল, সহিংসতা সৃষ্টি এবং প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
একাধিক সূত্র আরও জানায়, রাজধানীর অপরাধ জগতের কিছু অংশের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে অর্থ ও পরিকল্পনার যোগানদাতা হিসেবেও তার নাম উঠে আসছে।
রাজনৈতিক হত্যায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ
গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, ঢাকার মিরপুরে দোকানে ঢুকে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মোঘলের যোগসাজশের তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও অর্থায়নের পেছনেও তার ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়াও শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার অভিযুক্ত মিরপুরের কাউন্সিলর বাপ্পীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের তথ্য মিলেছে।
অভিযোগ রয়েছে, একসময় যুবলীগের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত এই দুজন মিলে রূপগঞ্জ ও মিরপুরের অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাতেন।
বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ
সূত্রমতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিদেশে পালিয়ে গেলেও কয়েক মাস আগে দেশে ফিরে আসেন মোঘল। এরপর বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে আঁতাত করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনরায় সংগঠিত করেন তিনি। ওই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই এখন নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র চলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
বিদেশে সম্পদ, ক্যাসিনো ও অর্থ পাচারের তথ্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোঘলের রয়েছে দুবাইয়ে ১০ বছরের গোল্ডেন ভিসা এবং থাইল্যান্ডে দীর্ঘমেয়াদি মাল্টিপল ভিসা। বিপদ আঁচ করলে দ্রুত দেশ ছাড়ার সক্ষমতাও তার রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত দুবাই, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কায় ক্যাসিনো খেলতে যান।
একটি সূত্রের দাবি, গত দেড় বছরে ক্যাসিনোতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হারিয়েছেন মোঘল, যা রূপগঞ্জ এলাকায় জোর-জুলুম, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে। হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত দেড় বছরে মোঘল অন্তত ১৭ বার দেশের বাইরে গেছেন। তার নামে একাধিক পাসপোর্ট রয়েছে এবং ইমিগ্রেশন রেকর্ডে অতীতে তার বিদেশ যাতায়াতের বিস্তৃত তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলা ও গ্রেপ্তারের দাবি
রূপগঞ্জ থানা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, প্রতারণা, হত্যাচেষ্টা ও সহিংসতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, যার কিছু তদন্তাধীন। স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি এলাকায় একটি “ভয়ের সাম্রাজ্য” কায়েম করে রেখেছেন।
স্থানীয় সচেতন মহল ও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল মনে করছে, আসন্ন নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ রাখতে এখনই তারিকুল ইসলাম মোঘলকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে যেকোনো সময় বড় ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার আশ্বাস মিললেও এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে জনমনে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছেই।









Discussion about this post