নিজস্ব প্রতিবেদক :
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শেষে সেই পলাতক ওসমানীয় প্রেসক্রিপশনে দেশের পোশাক খাতের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠন বিকেএমইএ’র নেতৃত্বে ঘটে নাটকীয় পরিবর্তন।
তৎকালীন সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান আড়ালে চলে গেলে সংগঠনের নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম কার্যত নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে সেলিম ওসমানের একটি চিঠির মাধ্যমে তাকে সভাপতি করার প্রস্তাব সামনে আসে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই হাতেমকে ঘিরে নানা বিতর্ক এবং প্রশ্ন তৈরি হয়।
খাত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন সেলিম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত থাকলেও হাতেম স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।
এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়েই তিনি বিতর্কের মধ্যেও বিকেএমইএর নেতৃত্বে নিজ অবস্থান দৃঢ় করতে সক্ষম হন।
তবে তার নেতৃত্ব গ্রহণের সময়ই তীব্র আপত্তি তোলেন বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন শীর্ষ নেতা।
মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান এবং তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি গিয়াসউদ্দিন প্রকাশ্যে হাতেমের অতীত রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তাদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার পর হঠাৎ করে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
সমালোচনার জবাবে সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া না দিয়ে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন হাতেম—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
পোশাক শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত, অর্থাৎ কারখানার ঝুট বা ওয়েস্টিজ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে নতুন এক সমীকরণ গড়ে তোলেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানার ঝুট ব্যবসা স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টনের উদ্যোগ নেন হাতেম নিজেই।
সূত্রগুলোর দাবি, এই প্রক্রিয়ায় বিএনপির স্থানীয় নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে ওই ব্যবসার অংশ তুলে দেওয়া হয়। মধ্যস্থতাকারী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ঝুট ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবে এই বণ্টন ছিল হাতেমের উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি নতুন নেটওয়ার্কের অংশ।
ফলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হন মাঠপর্যায়ের অনেক রাজনৈতিক কর্মী ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা।
আর এ কারণেই হাতেমের ঘৃণ্য ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কিরে প্রশ্ন উঠলেই হিংস্র পশুর মত আচরণ শুরু করে হাতেমের কাছ থেকে পাওয়া সুবিধাভোগী চক্র।
এর ফলে শুরুতে বিকেএমইএর নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি থাকলেও ধীরে ধীরে সেই বিরোধিতা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায়—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্টদের।
রাজনৈতিক বক্তব্যেও এই বিরোধের প্রতিফলন দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর জামায়াতের এক অনুষ্ঠানে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, কিছু ব্যবসায়ী মহল ভিন্ন পরিচয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা করছে এবং তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
একই বছরের নভেম্বরে তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি গিয়াসউদ্দিন আরও কঠোর ভাষায় হাতেমের সমালোচনা করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছর ওসমান পরিবারের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন হাতেম এবং তাকে স্বৈরাচারী সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলেও আখ্যা দেন।
তিনি বিকেএমইএর তৎকালীন কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব গঠনের আহ্বান জানান।
এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ছাত্ররাজনীতির মঞ্চেও হাতেমকে নিয়ে বিতর্কের ঘটনা ঘটেছে।
তোলারাম কলেজের একটি অনুষ্ঠানে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে শক্ত সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন হাতেম। সেই প্রভাবের কারণেই কারখানা মালিকরা অনেক ক্ষেত্রে তার নির্ধারিত দরেই ঝুট বিক্রি করতে সম্মত হন।
ফলে ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে—যেখানে শিল্প মালিক, রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যবসায়ী স্বার্থ এক জটিল কাঠামোর মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থনৈতিক বলয়ই হাতেমের প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করেছে। যারা এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তাদের অনেকেই অর্থনৈতিক সুবিধার কারণে প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করতে অনীহা দেখান।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, পোশাক খাতের ঝুট ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরেই বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। সেই খাতকে কেন্দ্র করে যদি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থের জাল বিস্তৃত হয়, তবে তা শুধু ব্যবসায়িক পরিবেশ নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে অনেকের প্রশ্ন—ঝুট ব্যবসাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই অর্থনৈতিক প্রভাববলয় কি শুধুই একটি ব্যবসায়িক বাস্তবতা, নাকি এর মধ্যেই গড়ে উঠছে নতুন ধরনের ক্ষমতার রাজনীতি ?









Discussion about this post