নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার চর রাজাপুর এখন যেন এক নীরব বিপর্যয়ের নাম। জনবসতির মাঝখানে প্রকাশ্যে গড়ে তোলা হয়েছে একটি অবৈধ মিনি ট্যানারি—যেখানে আইন, পরিবেশ ও মানবিকতা সবকিছুকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিনের পর দিন চালানো হচ্ছে বিষাক্ত কার্যক্রম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘কসাই রহমান’ নামের এক ব্যক্তি কোনো ধরনের অনুমোদন বা লাইসেন্স ছাড়াই এই ভয়ংকর কারখানা পরিচালনা করে পুরো এলাকাকে স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
দুর্গন্ধে দমবন্ধ, বিষে জর্জরিত পরিবেশ
নরসিংপুর শামসুল আলমের মোড় থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে গড়ে ওঠা এই কারখানাটি যেন একটি “বিষাক্ত বর্জ্যের কারখানা”। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে উৎপন্ন পচা রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ও রাসায়নিক মিশ্রিত পানি সরাসরি পাশের পুকুরে ফেলা হচ্ছে। এতে পুকুরের পানি সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, মাছ মরে ভেসে উঠছে, আর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে অসহনীয় দুর্গন্ধ।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, “ঘরের ভেতরে বসে থাকাও দায় হয়ে গেছে—শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, শিশু ও বৃদ্ধরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।” এটি শুধু পরিবেশ দূষণ নয়, বরং সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর নির্মম আঘাত।
আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি, প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা
ট্যানারি পরিচালনার জন্য যেখানে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স, ফ্যাক্টরি লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিস সার্টিফিকেটসহ একাধিক অনুমোদন বাধ্যতামূলক—সেখানে এই কারখানাটি চলছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। নেই কোনো ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার), নেই শ্রমিক নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা।
অভিযোগ রয়েছে, এসব আইনি বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করেই ‘ম্যানেজ’ করে বছরের পর বছর এই কারখানা চালিয়ে যাচ্ছেন মালিক। এতে প্রশ্ন উঠেছে—প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার নীরব সহযোগিতা ছাড়া কি এমন কর্মকাণ্ড সম্ভব ?
অপরাধের আখড়া : মাদক, অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ
এলাকাবাসীর দাবি, এই কারখানাকে ঘিরে প্রতিদিন রাতেই জমে ওঠে এক ধরনের অপরাধের আখড়া। বহিরাগত কসাই ও চামড়া ব্যবসায়ীদের আনাগোনার আড়ালে সেখানে চলে মাদক সেবন ও বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ। ফলে এলাকাটির সামাজিক পরিবেশও মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটছে।
নৈতিক অবক্ষয়ের অভিযোগও রয়েছে
কারখানার মালিক কসাই রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক পরকীয়া ও সামাজিক অবক্ষয়ের অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরছে।
এমনকি এসব অভিযোগে আগে স্থানীয়ভাবে সালিশ বসে জরিমানাও করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে ব্যক্তি হিসেবে তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এখন জনস্বার্থের জন্যও হুমকিতে রূপ নিয়েছে।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিস্ফোরণের আশঙ্কা
চরম ক্ষোভে ফুঁসছে চর রাজাপুরের বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ—বারবার জানানো হলেও প্রশাসন এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এতে পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
এলাকাবাসী নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করে বলেন, “এই অবৈধ ট্যানারি অবিলম্বে বন্ধ না করলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো।”
পরিশেষে বলা যায়, একটি অবৈধ মিনি ট্যানারি কেবল পরিবেশ ধ্বংস করছে না—এটি আইন, নৈতিকতা ও জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কবে এই ‘বিষের কারখানা’র বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, নাকি প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এভাবেই চলতে থাকবে জনদুর্ভোগের এই কালো অধ্যায়।









Discussion about this post