স্টাফ রিপোর্টার :
রাষ্ট্র তাকে দিয়েছিল ইউনিফর্ম, কাঁধে জ্বলজ্বলে নক্ষত্র। শপথ ছিল জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার। কিন্তু সেই পোশাকের আড়ালেই গড়ে উঠেছিল এক ভয়ংকর দানবীয় রূপ। তিনি পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক—নামে রক্ষক, কাজে যেন এক নির্মম ভক্ষক।
রূপগঞ্জের বালুচর থেকে বান্দরবানের পাহাড়, মেঘনার তীর থেকে সুনামগঞ্জের হাওর—সবখানেই ছিল তার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ।
রূপগঞ্জে নির্যাতন ও জমি দখলের ভয়াল চিত্র
২০১৭ সালে রূপগঞ্জের বাসিন্দা জাহের আলীর ৬২ বিঘা জমির ওপর নজর পড়ে তৎকালীন অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হকের। অভিযোগ রয়েছে, তাকে টানা ১৩ দিন ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়।
ভুক্তভোগী জাহের আলী বলেন,
“পোলার সামনে বাপরে মারে, বাপের সামনে পোলারে মারে। মাইয়ার জামাইরে মারে। আপনি মনে করেন, এই অবস্থায় কেউ কি জোর করে সই দিতে বাধ্য হয় না ? আর চার দিন থাকলে আমাদের লাশও পাওয়া যেত না।”
অভিযোগ অনুযায়ী, রিমান্ডের ভয় দেখিয়ে জমি লিখে নেওয়াই ছিল তার ‘সিগনেচার স্টাইল’। শুধু জাহের আলী নন, রূপগঞ্জে আরও অসংখ্য ব্যক্তি একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানা যায়।
হাজী মো. সোলমান বলেন, তার কয়েকটি মাছের প্রজেক্টসহ প্রায় ৬ বিঘা জমি দখল হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, ভুক্তভোগী আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী শুক্কুর বানু অভিযোগ করেন, “রাত দুইটার দিকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়।”
আনন্দ হাউজিং : ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যের অভিযোগ
পূর্বাচল সংলগ্ন রূপগঞ্জের একাধিক মৌজায় প্রায় ৩ হাজার বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে ‘আনন্দ হাউজিং’ নামের একটি বিশাল প্রকল্প, যার বাজারমূল্য আনুমানিক সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা।
‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং’ নামে পরিচিত হলেও অনুসন্ধানে জানা যায়, এটি মূলত মোজাম্মেল হক ও তার স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক প্রকল্প। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ জমি জোরপূর্বক দখল বা নামমাত্র মূল্যে কিনে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্র ও পেটুয়া বাহিনীর সহায়তায় এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
সম্পদের বিস্তার : রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল
ঢাকার উপকণ্ঠ ডেমরায় ৩১ শতাংশ জমির ওপর স্ত্রীর নামে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ব্রিজ ফার্মাসিউটিক্যালস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। যদিও সাইনবোর্ডে প্রকৃত মালিক হিসেবে মোজাম্মেল হকের প্রভাবই স্পষ্ট।
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার হরিপুর গ্রামে প্রায় ২০০ বিঘা জমির ওপর ‘মেঘনা রিসোর্ট’ নামে আরেকটি প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে ‘ডিআইজি প্রজেক্ট’ নামে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে ও কৃষিজমি নষ্ট করে এই প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছে।
দেশজুড়ে বাগানবাড়ি ও সম্পদ
সুনামগঞ্জে প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর একটি বাগানবাড়ি এবং বান্দরবানে ১৭৫ বিঘা জমির আতর বাগানের মালিকানা রয়েছে এই দম্পতির নামে।
তার ম্যানেজার মামুন মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু পুকুরই রয়েছে অন্তত আটটি।
বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে নিয়মিত যাতায়াত এবং বিপুল অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, হুন্ডিসহ বিভিন্ন অবৈধ পদ্ধতিতে বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান ও সম্পদের হিসাব
ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে মোজাম্মেল হকের নামে প্রায় ১২ কোটি টাকা এবং তার স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের নামে আরও প্রায় ৩ কোটি টাকার অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম জানান, তাদের জমা দেওয়া সম্পদের বিবরণ যাচাই-বাছাই চলছে।
চাকরি জীবন ও বিতর্ক
২৬ বছরের চাকরি জীবনের বড় অংশই কেটেছে দাপ্তরিক টেবিলে। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা সীমিত হলেও অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। কক্সবাজারে কর্মরত থাকাকালীন সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগে স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখেও পড়তে হয় তাকে।
২০২৫ সালে অবসরে যান মোজাম্মেল হক। অবসরের আগে থেকেই আড়ালে থাকার চেষ্টা করলেও বর্তমানে তার আবাসন ও অন্যান্য ব্যবসা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলছে।
প্রশ্নবিদ্ধ ন্যায়বিচার
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর মতে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, বরং গুরুতর অপরাধ।
আইনের রক্ষক যখন ভক্ষকে পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সাক্ষী।
এখন প্রশ্ন—
ক্ষমতার প্রভাব কাটিয়ে এই অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু বিচার হবে কি ?
ভুক্তভোগীরা কি ন্যায়বিচার পাবেন ?
নাকি এসব অভিযোগ কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে ?
জাহের আলীদের মতো শতাধিক পরিবারের চোখ এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।









Discussion about this post