মুনাফার লোভে ঠিকাদারদের গাফিলতি, পুষ্টির বদলে বিষ খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা—প্রশাসনের হুঁশিয়ারি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য চালু থাকা স্কুল ফিডিং (মিড-ডে মিল) কর্মসূচিতে চরম অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের বরাদ্দকৃত পুষ্টিকর খাবার শিশুদের হাতে পৌঁছানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তাদের খাওয়ানো হচ্ছে নিম্নমানের, বাসি ও দুর্গন্ধযুক্ত খাদ্য। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পেটের পীড়া ও নানা শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে—যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং মানবিকতার চরম লঙ্ঘন।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত এই কর্মসূচিতে রূপগঞ্জ উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার ১১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২২ হাজার ৯২৩ শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) যৌথভাবে খাদ্য সরবরাহ করলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
খাবারের তালিকায় পুষ্টিকর উপাদান থাকলেও তা বাস্তবে রূপ পাচ্ছে না।
অধিকাংশ বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ও পচা বনরুটি, দুর্গন্ধযুক্ত ডিম, নিম্নমানের দুধ এবং অস্বাস্থ্যকর ফল। কোথাও কোথাও রুটিতে পোকা, ডিমে পচা গন্ধ এবং কলায় রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এমন খাবার শিশুদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে নির্লজ্জভাবে—যা কেবল অনিয়ম নয়, এটি সরাসরি শিশুস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের অপরাধ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অনিয়ম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার ফল।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত মুনাফার লোভে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার নামে তাদের জীবনের সঙ্গে এমন নির্মম ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই সহ্যযোগ্য নয়।
অভিভাবকদের অভিযোগ, অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে তাদের সন্তানরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ পেটের পীড়া, বমি ও জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরছে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে শিক্ষা কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কিছু বিদ্যালয়ে আবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের অজুহাতে নিয়মিত খাবার বিতরণ বন্ধ রাখা হচ্ছে।
কাঞ্চন পৌরসভার বিরাবো ও কেন্দুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে এ চিত্র দেখা গেছে।
অথচ ঠিকাদারদের দাবি—“মাত্র ২/৩টি স্কুলে সামান্য সমস্যা হয়েছে।” এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং দায় এড়ানোর অপচেষ্টা বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিরাবো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রওশন আরা বেগম বলেন, “বাসি ও দুর্গন্ধযুক্ত খাবার বিতরণ অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
অন্যদিকে, সাব-ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম প্রিন্স দাবি করেছেন, “প্রতিদিনের খাবার প্রতিদিনই স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বিতরণ করা হচ্ছে, এখানে অনিয়মের সুযোগ নেই।”
তবে মাঠের বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে। প্রশ্ন উঠেছে—কার স্বার্থে এই ধামাচাপা? কারা এই অনিয়মের পেছনে মদদ দিচ্ছে ?
রূপগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসার মাহরুক জাবীন জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে ঠিকাদাররা শতভাগ খাবার সরবরাহ করতে পারছেন না। তবে এই যুক্তি দিয়ে নিম্নমানের বা পচা খাবার সরবরাহের দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম বলেছেন, “অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই ব্যবস্থা কবে নেওয়া হবে ? শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে এমন ভয়াবহ খেলা চলতে থাকলেও কেন দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেই ?
বিশ্লেষণ:
স্কুল ফিডিং কর্মসূচি একটি মহৎ উদ্যোগ, যার লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়া রোধ করা। কিন্তু কিছু অসাধু ঠিকাদার ও দায়িত্বহীন তদারকির কারণে এই মহৎ উদ্যোগই এখন শিশুদের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
প্রত্যাশা:
অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নজরদারি জোরদার করতে হবে। দায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিতে নিয়মিত মনিটরিং ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
শিশুদের পুষ্টির টাকা লুটে নেওয়া মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করা। এই অনিয়ম আর কোনোভাবেই সহ্য করা যাবে না।
এখনই সময়—দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার।









Discussion about this post