নারায়ণগঞ্জ নিউজ আপডেট :
আইনশৃংখলা পরিস্থিতি যখন ঢিলেতালে চলে তখন অপরাধীরা তাদের অপরাধের মাত্রা এতই বৃদ্ধি করে তার প্রমাণ আবারো দিলেন সিদ্ধিরগঞ্জের দন্ডমূর্তের বর্তমান কর্তা নাসিক প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতি ।
২০১৪ সালে ২৭ এপ্রিলের আগ মূহুর্ত পর্যন্ত কাউন্সিলর নূর হোসেন এতটাই বেপরোয়া ছিলো যে তাকে খোদ স্থানীয় সংসদ সদস্য থামাতে পারে নাই। সাত খুন করে পালিয়ে যাবার পর জেলা প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীর টনক নড়ে। ঠিক তেমনি মতি এখন এতটাই বেপরোয়া তার আচরণ একজন মন্ত্রীকেও হার মানায় । যা শাসক দল আওয়ামীলীগের অনেক নেতাই রয়েছে বিব্রতকর অবস্থায় ।
নাসিক প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতি মোবাইল ফোনে জমির মালিক ইসমাইলের মুঠোফোনের রেকর্ড প্রকাশিত হলে তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠে জেলাজুড়ে।
রেকর্ডকৃত তথ্য থেকে জানা যায়, সংঘর্ষের আগে জমির মালিক ইসমাইলের মুঠোফোনে কল করেন প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতির সহযোগী মানিক। প্রথমে ইসমাইলকে কাউন্সিলর অফিসে আসতে বলেন মতির সহযোগী মানিক। তখন ইসমাইল মানিককে বলে সে এখন নামাজে যাবে মাগরিবের নামাজের পরে সন্ধ্যায় কাউন্সিলর অফিসে আসবেন। তখন মানিক প্যানেল মেয়র মতিকে ফোন দিলে ইসমাইল প্যানেল মেয়র মতিকে সালাম দেয়। কিন্তু মতি সালামের জবাব না দিয়েই তাকে বলে, এক্ষুনই আসবি নাকি লোক দিয়া ধরাইয়া আনমু। ইসমাইল তাকে নামাজের পরে কাউন্সিলর অফিসে আসবে বলে জানালে মতি ক্ষুব্দ হয়ে তাকে বলে এখনই না আসলে তাকে পেটাতে পেটাতে বাড়ি থেকে ধরে আনা হবে। মতি তখনই তার অনুগামীদের নির্দেশ দেন ইসমাইলকে পিটাতে পিটাতে বাড়ি থেকে ধরে আনার জন্য। তখন মতি ইসমাইলকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করে তাকে জিজ্ঞেস করে তোর জন্মদাতা কয়টা। তুই আমারে চিনস ? তখন ইসমাইল মতিকে বলে ভাই আপনি এভাবে গালাগালি করছেন কেন। আপনি কথা ভাল মতো বলেন। তখন মতি আরো ক্ষুব্দ হয়ে ইসমাইলকে বলে তোকে কেন এর জবাব দিতে হবে। তুই পার পেয়ে গেছিস বলে মনে করছস। আমি তোরে দেইখ্যা দিমু। তোর জায়গা…তোর…। তুই এখন আমার অফিসে হাজির হবি। তোর বাপে তোরে অর্ডার দিসে আমি তোর বাপ তোরে পিটামু তুই এখন অফিসে আয়। তোরে আমি কি করি তুই দেখবি। এই বলে প্যানেল মেয়র মতি ফোন রেখে দেন।
অসংখ্য অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আদমজী নতুন বাজার এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ৩ জানুয়ারী আওয়ামীলীগের দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনার আগে জমির মালিক আওয়ামীলীগ কর্মী ইসমাইলকে পিটাতে পিটাতে বাড়ি থেকে ধরে আনার হুমকী দিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের আহবায়ক মতিউর রহমান মতি।
এসময় ইসমাইলকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দও করেন এবং তাকে দেখে নেয়ার হুমকী দেন কাউন্সিলর মতি। গালিগালাজের ধরণ এতটাই উগ্র যা যে কোন সাধারণ মানুষ সহ্য করতেও কস্ট হওয়ার কথা । আর মতিউর রহমান মতির আচরণ দেখে অনেক ভুক্তভোগি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কথায় কথায় অস্ত্র বের করে পুরো এলাকার সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে আসছে মতি । সাত খুনের পর মতি যেন আরেক নূর হোসেন হিসেবে এলাকায় আবির্ভার ঘটেছে । তার নিয়ন্ত্রণে বিশাল বাহিনী ছাড়াও নূর হোসেনের কায়দায় মতি অনেক বিশেষ শ্রেনী পেশার লোকজন এবং প্রশাসনের অনেক অসাধুদের লালন পালন করে আসছিলো কয়েক বছর যাবৎ।
আদমজী নতুন বাজার এলাকায় সাবেক কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম মন্ডলের সমর্থক আবদুল হান্নান ও ইসমাইলদের সঙ্গে প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতির অনুগামী আবদুর রাজ্জাকের ৯ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। ওই বিরোধ নিয়ে কয়েক দফায় শালিসী বৈঠকও হয়। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় উভয় পক্ষের লোকজন আবারো জড়ো হলে প্রথমে বাকবিতন্ডার ঘটনা ঘটে। ওই সময়ে প্যানেল মেয়র মতি অকথ্য ভাষায় হান্নান ও ইসমাইলকে গালাগাল করে। এক পর্যায়ে কাউন্সিলর মতি সাবেক কাউন্সিলর ইসমাঈলকে কয়েকটি চর থাপ্পর দেয় । এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সাবেক কাউন্সিলর ইসমাঈল তার হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে মতির মাথায় এবং মুখমন্ডলে আঘাৎ করলে রক্তাক্ত যখম হয় মতি।
এমতাবস্থায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে হান্নান, ইসমাইল, মজিবর, সানু, আলমগীর, রোকেয়া, সুরভী, রাজ্জাক মিয়া, মনির হোসেন, সোহেল, ফারুক হোসেনসহ কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়। তাদের স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। মতিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসার পর সিদ্ধিরগঞ্জে উপস্থিত হয়ে ফের ঢাকার একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় ।
আওয়ামীলীগ কর্মী ইসমাইল জানান, তার বড় ভাই ইব্রাহিমের মাথায় ১৯৯৪ সালে বিএনপির সন্ত্রাসীরা গুলি করেছিলো। তখন গুলিবিদ্ধ ইব্রাহিমকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। আমরা আওয়ামীলীগের একনিষ্ঠ কর্মী হলেও যুবলীগ সভাপতি ও প্যানেল মেয়র মতি স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের উপর কি পরিমাণ নির্যাতন চালাচ্ছে মতি তা এলাকার সকলেই খুব ভালো করে টের পাচ্ছেন ।
অথচ ১৯৯৮ সালে জাতীয় পার্টির ক্যাডার মতি যোগ দেয় যুবলীগে। নিরীহ মানুষের জায়গা জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে এবং অবৈধভাবে চোরাই তেলের ব্যবসা করে শতকোটি টাকার মালিক হয়ে তিনি কাউকেই তোয়াক্কা করে না কাউকেই। আমাদের পৈত্রিক জমিও তিনি ওয়ারিশানের নাম দিয়ে দখলের চেষ্টা করছেন। বৃহস্পতিবার সে দলবল নিয়ে আমাদের জমি দখল করতে আসলে আমরা তাদেরকে বাধা দেই। মতির আহত হওয়ার বিষয়টি সকলের নজরে আসলেও কি পরিমাণ তান্ডব সে করেছিলো তা অনেকের অজানা। পরবর্তীতে মতির ক্যাডাররা আমাদের বসতবাড়ি ও দোকানে হামলা চালিয়ে ব্যপক ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। এসময় তারা আমাদের বসতবাড়িতে থাকা গৃহবধুদেরও শ্লীলতাহানি করতে একটুকুও হাত কাপে নাই মতি বাহিনীর সন্ত্রাসীদের ।
বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন নারায়ণগঞ্জ জেলার শাখার সভাপতি ও সাবেক নাসিক সিরাজুল ইসলাম মন্ডল অভিযোগ করে জানান, রাজ্জাক, হানান শেখ ও ইসমাইল তারা সকলেই মতির সমর্থক। তারা আমার সমর্থক নয়। তাদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। কিন্তু এ ঘটনায় মতির সমর্থকরা আমার এক সমর্থককে মারধর করেছে ও তারা বঙ্গবন্ধু কাউন্ডেশন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা শাখার কার্যালয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। ওই কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি, শেখ হাসিনার ছবি, শামীম ওসমানের ছবি পুুড়িয়ে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ৪ জানুয়ারী মধ্যরাতে সংঘর্ষের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করেছেন মতির ভাই ও প্রতিপক্ষ রোকেয়া বেগম। মতির ভাই মাহবুবুর রহমান মামলায় উল্লেখ করেন, তার ভাই প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতি ৩ জানুয়ারি সকালে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে বের হয়। এসময় পথিমধ্যে ইসমাইল, হান্নান, ফারুক, মজিবর, নাঈম, আলমগীর, হাসান, মোস্তফাসহ অজ্ঞাত ১৫ জন মতিকে মারধর ও কুপিয়ে জখম করে। এতে সে মারাত্মক আহত হয়। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই এ হামলা বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এ মামলায় ফারুককে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
অপরদিকে মতি গংদের আসামি করে পাল্টা মামলা করেছেন রোকেয়া বেগম। তিনি মামলায় উল্লেখ করেন সুমিলপাড়া নতুন বাজার আবেদ আলীর হাজী বাড়িতে তার পৈত্রিক সাড়ে ৩ শতাংশ জমি রয়েছে যা দখল করতে সেখানে যায় মামলায় বিবাদীরা এবং দেশিয় অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের উপর হামলা করে তাদের বাড়িঘরের ১০ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করেন। এতে তাদের কয়েকজন আহত হয় বলেও মামলা উল্লেখ করা হয়। মামলায় বিবাদীরা হলেন- রাজ্জাক, মনির, রফিকসহ অজ্ঞাত ১০ জন। এরা সকলেই প্যানেল মেয়র মতির লোক।









Discussion about this post