সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডেরা দুবাই, বার দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ, ফুজাইরা ও রাস আল খাইমায় অন্তত ৪০-৪৫টি বাঙালি ড্যান্স বার রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো তরুণীদের মূলত এসব বাঙালি বারে কাজ করতে নেওয়া হয়। ড্যান্স বারে কর্মরত ভূক্তভোগী কয়েকজন তরুণী জানান, নারায়ণগঞ্জের ‘গাঙচিল ড্যান্স ফ্লোর’ এবং ‘তারার মেলা নৃত্য একাডেমি’–এর শিক্ষক মো. আকতার হোসেনও মেয়েদের বাইরে পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত। ওই দুই প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন ছাত্রও একই কাজে যুক্ত বলে অভিযোগ আছে।
নারায়ণগঞ্জ নিউজ আপডেট :
নারায়ণগঞ্জে নাচের স্কুল খুলে অল্প বয়সী কিশোরী-তরুণীদের বিদেশের ড্যান্স বারে পাচার করা হচ্ছে। সেখানে তাদের যৌন পেশাও বাধ্য করা হচ্ছে। এমন অভিযোগ রয়েছে নারায়ণগঞ্জের ‘গাঙচিল ড্যান্স ফ্লোর’, ‘তারার মেলা নৃত্য একাডেমি’র প্রশিক্ষক মো. আকতার হোসেন এবং ‘এডিসি অনিক ড্যান্স কোম্পানি’র অনিক সরকার নামে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তারা নিম্নবিত্ত পরিবারের অল্প বয়সী তরুণীদের (বয়স ১৬-২২) আরব আমিরাতে পাচার করেন।
দৈনিক প্রথম আলো এক প্রতিবেদনে বলছে, ড্যান্স বারে কাজ দেওয়ার নামে তরুণীদের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইসহ বিভিন্ন শহরে পাচারে সক্রিয় রয়েছে বেশ কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র। এদের প্রধান লক্ষ্য নিম্নবিত্ত পরিবারের তরুণীরা। তাঁদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে সেখানে নিয়ে যৌন পেশায়ও বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি একটি সংস্থার প্রাথমিক অনুসন্ধানে এমন অন্তত ৫০ জনের নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা এভাবে তরুণীদের পর্যটন ভিসায় দুবাই, আবুধাবি, শারজায় পাঠানোতে যুক্ত রয়েছেন। তাদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের অনিক সরকার ও আকতার হোসেন নামে দুই ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে।
ভুক্তভোগী কয়েকজন তরুণী জানান, নারায়ণগঞ্জের ‘গাঙচিল ড্যান্স ফ্লোর’ এবং ‘তারার মেলা নৃত্য একাডেমি’র শিক্ষক মো. আকতার হোসেনও মেয়েদের বাইরে পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত। ওই দুই প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন ছাত্রও একই কাজে যুক্ত বলে অভিযোগ আছে।
আকতারের একটি মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার স্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া যায় অনিক সরকার নামে এক ব্যক্তির নাম। অনিকের মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে দেখা যায় এই অনিক ‘এডিসি অনিক ড্যান্স কোম্পানির’ অনিক সরকার। তাঁর মুঠোফোন যোগাযোগ করে সেটিও বন্ধ পাওয়া গেছে।
এই আকতার হোসেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের আরামবাগ এলাকার ইব্রাহিমের ছেলে। সে নিজেকে একজন সাংস্কৃতিক কর্মী বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। গত ৭ দিন যাবৎ আকতার নিখোঁজ রয়েছে বলে দাবি তার পরিবারের লোকজনের। গত শুক্রবার (১৫ নভেম্বর) আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে নাসিক ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দুই নম্বর বাস স্ট্যান্ডে অবস্থিত আক্তারের ‘গাঙচিল ড্যান্স ফ্লোর’ থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে সে আর ফিরে আসেনি এবং তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে দাবি স্বজনদের। এ ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (নং-৭৯৯) করা হয়। পরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়েও এ বিষয়ে একটি অভিযোগ (যার নং-২৩২৯) দেয়া হয়েছে। র্যাব কার্যালয়েও এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে বলে জানায় নিখোঁজ আক্তার হোসেনের পারিবার।
নারায়ণগঞ্জের একটি বস্তি থেকে যাওয়া ১৯ বছরের এক তরুণী এই কাজে যুক্ত হওয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সাত-আট বছর আগে তিন ভাইবোনকে রেখে তাঁর বাবা অন্যত্র বিয়ে করেন। এরপর তাঁদের মা পোশাক কারখানায় কাজ করে তাঁদের বড় করেন। মা অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাঁকে পরিবারের হাল ধরতে হয়। তিনি পোশাক কারখানায় কাজ নেন। কিন্তু তা দিয়ে সংসার চলছিল না। তখন বস্তির এক তরুণী তাঁকে দুবাই যাওয়ার বিষয়টি জানান।
সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া এই তরুণী জানান, ২০১৮ সালের নভেম্বরে অনিক সরকার নামে এক যুবকের মাধ্যমে তিনি প্রথম আরব আমিরাতের ‘ড্যান্স ক্লাবে’ যান। তিন মাস থেকে ফিরে আসেন। এরপর এই বছরের মাঝামাঝিতে আরেকবার গিয়েছিলেন। নাচের কথা বলে নেওয়া হলেও এক পর্যায়ে যৌন পেশায় বাধ্য করা হয়।
এই বক্তব্যের স‚ত্র ধরে ঢাকার কয়েকটি কথিত ‘ড্যান্স স্কুলে’ খোঁজ-খবর করা হয়। এর মধ্যে অনিক সরকার নামে যে যুবকের কথা ওই তরুণীরা জানিয়েছে তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহে। লেখাপড়া করেছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে নাচ শেখেন। এক সময় দুবাই যান। সেখান থেকে ফিরে এসে নিজেই নাচের প্রতিষ্ঠান খোলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নাচের স্কুলের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি বলেন, নৃত্য শেখানোর নাম করে এই যুবক দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষাকৃত কম বয়সী তরুণী মেয়েদের দেশের বাইরে পাঠাচ্ছেন। তাঁর চলাফেরাও বেশ বিলাসী।
এই ঘটনা খোঁজ করতে গিয়ে জানা যায়, বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরেও আছে। নারায়ণগঞ্জে দায়িত্বরত র্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলেপ উদ্দিন বলেন, এ বিষয়ে তাঁরাও খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। বাংলাদেশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, দু’জায়গায়ই নারী পাচারকারী বিভিন্ন চক্রের বিষয়ে তাঁরা তথ্য পেয়েছেন।
এই কর্মকর্তা জানান, তাঁরা তথ্য পেয়েছেন যে, পাচারের শিকার মেয়েদের পাসপোর্ট, ভিসা থেকে শুরু করে যাতায়াত ও বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার যাবতীয় খরচ আরব আমিরাতের বার মালিকেরা বহন করে থাকেন। এ জন্য প্রতিটি জায়গায় চক্রের লোকজন রয়েছে।









Discussion about this post