ফতুল্লায় ৩ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। বিশাল এই এলাকার মানুষের জন্য নেই ময়লা ফেলার ভাগাড় বা ল্যান্ডফিল।
বছরের পর বছর গৃহস্থালি থেকে শুরু করে এ অঞ্চলের সব ধরনের ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে ডিএনডির খাল এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের দুই পাশে।
এতে এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জেলার দুটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প (ডিএনডি প্রকল্প এবং চাষাঢ়া-সাইনবোর্ড ছয় লেন প্রকল্প) ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নির্দিষ্ট কোনো ময়লার ভাগাড় বা ল্যান্ডফিল না থাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা বা ডিএনডি প্রকল্পের খালগুলোয় প্রতিদিন ফেলা হচ্ছে টনে টনে গৃহস্থালি বর্জ্য।
নিষ্কাশন খালের পাশে বসবাসকারী অধিকাংশ বাসিন্দাই সরাসরি খালে ময়লা ফেলছে। ফলে খালের বেশ কয়েকটি স্থান ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এসব বর্জ্য খালের তলানিতে জমা হওয়ার পাশাপাশি পাম্পিং স্টেশনের সামনে গিয়ে সেচযন্ত্রের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
বর্জ্যরে পচা পানিতে দূষিত হচ্ছে খালের পানি। এ ব্যাপারে এলাকাবাসী বেশ কয়েকবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে ল্যান্ডফিলের জন্য খাশজমি বরাদ্দ চেয়ে মানববন্ধন করেছেন।
প্রতিবারই আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, ফতুল্লায় ময়লা ফেলার জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হবে; কিন্তু এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি।
নারায়ণগঞ্জের বর্তমান জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ যুগান্তরকে বলেছেন, তিনি এখানে যোগ দেওয়ার পরই বুঝতে পেরেছেন জরুরি ভিত্তিতে ফতুল্লায় একটি ল্যান্ডফিলের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।
এই উপলব্ধি থেকে সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরাকে একটি খাসজমি দেখতে বলেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরা বলেন, ফতুল্লা এলাকার ময়লা ফেলার জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু বকরকে আমি একটি সরকারি খাসজমি খুঁজে বের করতে বলেছি ।
কিন্তু সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু বকর জানান, এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার নাকি সময়ই নেই তার। অথচ তার এই খামখেয়ালিপনায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ফতুল্লার কয়েক লাখ মানুষ।
বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের দুটি অগ্রাধিকার প্রকল্প। লিংক রোড ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের উপপ্রকল্প ব্যবস্থাপক ও উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী শাখাওয়াত হোসেন শামীম বলেন, রাস্তার দুই পাশে ফেলা আবর্জনা সরানোর জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। আবর্জনা সরাতে সিটি করপোরেশন ট্রাকপ্রতি ৪ হাজার টাকা করে চেয়েছে ।
ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকার বাজারের আবর্জনা ফেলার কোনো ডাস্টবিন না থাকায় সরাসরি ডিএনডির নিষ্কাশন খালে ফেলা হচ্ছে সব ধরনের বর্জ্য। ডিএনডির জলাবব্ধতা নিরসন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সেনা সদস্যদের বেশির ভাগ সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে এসব বর্জ্য অপসারণ করে খাল পরিষ্কারের কাজে।
এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই খালের ওপর এক থেকে দুই ফুট পুরুত্বের আবর্জনার স্তর জমে যাচ্ছে। একই চিত্র খালের পাশে থাকা সব বাজারের।
স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০১৬ সালের আগস্টে একনেকে ৫৫৮ কোটি ১৯ লাখ ৭৮ হাজার টাকার এ প্রকল্প পাশ হয়। ওই বছর প্রথম দফা অনুমোদনের সময় এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৫৮ কোটি টাকা।
সংশোধনের পর ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে হয় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ডিএনডির জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর।
সেনাবাহিনীর ১৯ কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন বর্তমানে ডিএনডির নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়ের) কাজ করছে। ২০২৩ সালে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
সেনাবাহিনী তখন এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বুঝিয়ে দেবে। খালে বর্জ্য ফেলার কারণে এ প্রকল্পের কাজে গতি কিছুটা কমেছে। বর্জ্য ফেলার পাশাপাশি প্রভাবশালী মহল খাল দখল করে বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে রেখেছে।
বারবার এগুলো অপসারণের তাগিদ দিলেও একটি প্রভাবশালী মহল এখন পর্যন্ত এগুলো অপসারণ না করায় প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ব্যয়ও। অথচ প্রশাসন থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি, বিষয়টি নিয়ে সবাই এক প্রকার নির্বিকার। ফতুল্লাবাসীর দাবি, পরিবেশের আরও ক্ষতি হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে এলাকায় একটি ল্যান্ডফিল প্রতিষ্ঠা করতে ।









Discussion about this post