পুলিশের সদর দফতরের নির্দেশনা অমান্য করে সোনারগাঁও থানায় অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে ইসমাইল হোসেন নামের একজন ইন্সপেক্টর কে নিয়োগ দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার ।
এমনকি প্রত্যুষ কুমার মজুমদার ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিককেও এ বিষয়ে অবহিত করেননি।
জোড়ালো অভিযোগ উঠেছে, মোটা অংকের টাকা নিয়ে এই নিয়োগ দিয়েছেন তিনি।
এরপূর্বে গত ৭ জুলাই নারাণগঞ্জের পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমারের সই করা এক চিঠিতে এই নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্ত ওই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নাম ইসমাইল হোসেন।
এমন কান্ডের পর সোনারগাঁও থানায় সদ্য যোগদানকৃত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি ইসমাইল হোসেনকে ক্লোজড করে ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি অফিসে সংযুক্ত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ ই জুলাই) ঢাকা রেন্জের ডিআইজি রেজাউল করিমের এক স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ আদেশ দেয়া হয়েছে।
তবে বিস্তারিত না বললেও প্রসাশনিক কারনে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন নারায়ণগঞ্জ খ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসিফ ঈমাম।
জানা যায়, গত ৭ ই জুলাই ইসমাইল হোসেন সোনারগাও থানায় যোগদান করেছিলেন।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, গত ১৭ জুন (মংগলবার) পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে সকল রেঞ্জ ডিআইজি এবং মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিট প্রধানদের চিঠির মাধ্যমে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়। যেখানে বলা হয়েছে, ৫২ বছরের ওপরে কোনো পুলিশ পরিদর্শককে থানায় ওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
ওই নির্দেশনায় জানানো হয়, গত ১৬ এপ্রিল পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে আইজিপি বাহারুল আলমের সভাপতিত্বে পলিসি গ্রুপের একটি মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় একটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হচ্ছে, দেশের যে কোনো থানার অফিসার ইনচার্জ হিসাবে ৫২ বছরের ওপরে কোনো পুলিশ পরিদর্শককে পদায়ন করা যাবে না।
এমন পদায়নের পর পুলিশ সদর দফতর থেকে জানা গেছে, পুলিশ পরিদর্শক মো. ইসমাইল হোসেনের বয়স ৫৪ বছর। তাকে গত সোমবার (৭ জুলাই) নারায়ণগঞ্জ জেলার এসপি সোনারগাঁও থানায় ওসি হিসেবে পদায়ন করেছেন। পরিদর্শক (ওসি) ইসমাইল হোসেন পোস্টিং অর্ডার পেয়ে ওই দিনই সন্ধ্যায় সোনারগাঁও থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে যোগ দেন।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে নারায়ণগঞ্জের এসপি প্রত্যুষ কুমারগণমাধ্যম কে বলেন, ‘ডিপার্টমেন্টের ভালোর জন্য অনেক বিষয়ে সিনিয়রদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইন্সপেক্টর ইসমাইল হোসেনকে সোনারগাঁ থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে পদায়নের আগে সিনিয়রদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ এক্ষেত্রে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনা ভায়োলেট করা হয়েছে কি না (?) এমন প্রশ্নে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
পুলিশ সদর দফতর থেকে জানা যায়, পুলিশ সুপার (এসপি) প্রত্যুষ কুমার বর্তমানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাউকেই পাত্তা দিচ্ছেন না। যা ইচ্ছা তাই করছেন। যখন যাকে মনে হচ্ছে তখন তাকে বদলি করেছেন। এতে মোটা অংকের টাকার বাণিজ্য হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে প্রত্যুষ কুমার মজুমদারের বিরুদ্ধে।
কোন ধরনের যোগ্যতার মাপকাঠি যাচাই না করেই এসব করা হচ্ছে বলেও পুলিশ সদর দফরের একাধিক কর্মকর্তা জানান যে, প্রত্যুষ কুমারের মতো আরও যে সকল এসপি এরকম আচরণ করছেন তাদের বিষয়ে পুলিশ সদর দফতর খোঁজ রাখছেন। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়াও প্রত্যুষ কুমার মজুমদার নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির একজন নেতার মাধ্যমে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড করছেন বলেও একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন ঘটনায় সোনারগাঁও থানায় ওসি হিসেবে পদায়ন হওয়া মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘পোস্টিং অর্ডার পাওয়ার পর সোমবার ওসি হিসেবে যোগ দিয়েছি।’ পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলেও জানান।
ইসমাইল হোসেনের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, দেশের শীর্ষ ধনী ওসিদের মধ্যে তিনি একজন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর থানা, গাজীপুরের টঙ্গী ও গাছা থানা, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, বরিশাল থানা ও কুমিল্লার বুড়িচং থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। তবে বারবারই অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে সকল থানা থেকেই।
ইসমাইল হোসেন বরিশাল থানার ওসি থাকাকালীন তার নামে বিভাগীয় মামলায় তাকে স্ট্যান্ড রিলিজও করা হয়। ওসি ইসমাইল চলেন বিলাসবহুল প্রাডো গাড়িতে। গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর সিলমান্দি এলাকায় ৫৬ বিঘা জমি রয়েছে তার।
গাজীপুরের গাছা এলাকায় ২০ বিঘা জমিতে গরুর খামার রয়েছে ইসমাইল হোসেনের। দুই ছেলে আমেরিকায় লেখাপড়া করেন। গত বছর কোটি টাকা খরচ করে বড় ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। রাজধানীর উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে সুবাস্তু টাওয়ারে ৩ হাজার ২০০ স্কয়ার ফিটের দুই কোটি টাকা মূল্যের আলিশান ফ্লাটও রয়েছে তার।
রূপগঞ্জে ইসমাঈল হোসেন ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিন মাসেই ১৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। মূলত: রূপগঞ্জের ওসি থাকাকালীন শত কোটি অবৈধভাবে হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে।
এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে ওসি ইসমাইল হোসেনকে ফোন করা হলে তিনি জানান, ‘প্রমোশনের সময় এলেই একটি প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ আমার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে, এবারও তাই হয়েছে।’









Discussion about this post