শহর প্রতিনিধি (৯ অক্টোবর ২০২৫)
নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম নয় দিনেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১৯৫ জন। এ নিয়ে চলতি বছর জেলাটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১৭ জনে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
হাসপাতালজুড়ে রোগীর ঢল
সরেজমিনে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতাল ও খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের তৃতীয় তলার ডেঙ্গু ওয়ার্ডে বেডের চেয়ে রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। কেউ করিডর বা মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন, কেউ হাতপাখা দিয়ে বাতাস নিচ্ছেন, কেউ আবার শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে অপেক্ষা করছেন চিকিৎসকের জন্য।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আগস্টে ভর্তি হয়েছিলেন ১১৬ জন, সেপ্টেম্বরেই সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২৯ জনে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ২৮ জন রোগী। চলতি বছর এখন পর্যন্ত শুধু এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৪৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত।
একই অবস্থা খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে। জুনে যেখানে ভর্তি ছিল মাত্র ২০ জন, সেপ্টেম্বরে গিয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭০ জনে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই ভর্তি হয়েছেন আরও ৫০ জন নতুন রোগী।
একজন রোগীর স্বজন অভিযোগ করে বলেন, “শয্যা না থাকায় মেঝেতে কষ্ট করে দিন কাটাচ্ছি। গরম, মশা—সব মিলিয়ে অবস্থা অসহনীয়। কিন্তু যাওয়ার জায়গা নেই, এখানেই থাকতে হচ্ছে।”
চিকিৎসা সংকট প্রকট
চিকিৎসকদের ভাষায়, রোগীর চাপে হাসপাতালের সক্ষমতা এখন চরম পরীক্ষার মুখে।
এমন ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. জহিরুল ইসলাম বলেন, “রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে, আমরা মেঝেতে চিকিৎসা দিচ্ছি। হাসপাতালের সক্ষমতা সীমিত, তবু কাউকে ফিরিয়ে দিচ্ছি না।”
জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্লাটিলেট কাউন্ট বা সেপারেশন মেশিনের অভাবেও জটিলতা বাড়াচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন রোগীকে ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে উন্নত চিকিৎসার জন্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর এই প্রকোপ কেবল রোগের প্রাদুর্ভাব নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও নাগরিক অসচেতনতার প্রতিফলন। থেমে থেমে বৃষ্টি, নোংরা ড্রেন, আবর্জনার স্তূপ এবং অপর্যাপ্ত মশা নিধন কার্যক্রম ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, “নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম চলছে। তবে মশার জিনগত পরিবর্তনের কারণে ওষুধের কার্যকারিতা কিছুটা কমে গেছে। নতুন ধরনের ডেঙ্গুর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
প্রশাসনের অবস্থান
জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মুহম্মদ মুশিউর রহমান অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলতে নারাজ।
তিনি (সিএস) আরো বলেন, “প্রতিদিন অনেক রোগী ভর্তি হচ্ছেন, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর খবর পাইনি। সচেতনতা বৃদ্ধি ও মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার করাই এখন প্রধান করণীয়।”
জনসচেতনতাই এখন প্রধান অস্ত্র
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। বাড়িঘর, ছাদ, ফুলের টব ও ড্রেনে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।









Discussion about this post