বন্দর প্রতিনিধি :
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনী এলাকাগুলোতে যেন আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে পুরনো অপকর্ম, ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক তুঘলকি কাণ্ড।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ–৫ আসনের বন্দর উপজেলায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে কুখ্যাত অপরাধ পরিবার হিসেবে পরিচিত মাকসুদ পরিবারকে ঘিরে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া বিতর্ক ও সহিংস ভাষার রাজনীতি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকে কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো বিএনপি, কখনো জাতীয় পার্টির পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় দাপট দেখানো মাকসুদ পরিবারের বিরুদ্ধে রয়েছে অসংখ্য গুরুতর অভিযোগ।
পুলিশকে মারধর, লুটপাট, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, নারি কেলেঙ্কারি, নির্যাতন—এমন কোনো অভিযোগ নেই যা এই পরিবারের সঙ্গে জড়িত নয় বলে স্থানীয়দের দাবি।
ওসমান পরিবারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় একসময় এই পরিবার ছিল কার্যত আইনের ঊর্ধ্বে। তাদের মুখের কথাই ছিলো এই অঞ্চলের আইন।
এলাকাবাসী তো বটেই, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও পুলিশ সদস্যরাও তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাননি।
অথচ সেই মাকসুদ পরিবারই এবার নির্বাচনের মাঠে এসে হুমকির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
নারায়ণগঞ্জ–৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেনের স্ত্রী ও প্রধান এজেন্ট নার্গিস আক্তার অভিযোগ করেছেন, বিএনপি প্রার্থীর অনুসারী যুবদলের এক নেতা প্রকাশ্যে তাকে হুমকি দিয়েছেন।
ঘটনার একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, বন্দর উপজেলা যুবদল নেতা হুমায়ুন কবীর নার্গিস আক্তারকে বহনকারী গাড়ির দিকে তেড়ে গিয়ে বলেন, ‘এখানে কেন এসেছেন ? এখনই চলে যান। এখানে আর আসবেন না। একদম খাইয়া ফালামু।’
—এ ধরনের ভাষা নির্বাচনী আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে নার্গিস আক্তার বলেন, ‘আমরা দোকানে দোকানে লিফলেট দিচ্ছিলাম। তখন অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়। পরিস্থিতি খারাপ বুঝে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হই। এ ঘটনায় আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’
তবে অভিযুক্ত যুবদল নেতা হুমায়ুন কবীর অভিযোগ অস্বীকার করে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তার দাবি, ‘মাকসুদের লোকজন এলাকায় ভোটার ও মন্দিরে টাকা বিতরণ করছিল। আমরা এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এর প্রতিবাদ করেছি। আমি কাউকে হুমকি দিইনি, খারাপ উদ্দেশ্যও ছিল না।’
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা শিবানী সরকার জানিয়েছেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রধান এজেন্ট লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্তাধীন।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি হুমকি বা ভিডিওর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনী রাজনীতির নৈতিক দেউলিয়াপনার প্রতিচ্ছবি।
যাদের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ভয়াবহ অপরাধের অভিযোগ ছিল, তারা আজ নিজেদের নির্যাতিত হিসেবে উপস্থাপন করছে। আবার যারা পরিবর্তনের রাজনীতির কথা বলছে, তাদের একাংশের ভাষা ও আচরণও প্রশ্নবিদ্ধ।
নির্বাচন মানেই যদি পুরনো অপরাধীদের পুনর্বাসন, ভয়ভীতি আর পেশিশক্তির মহড়া হয়—তাহলে সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে, সে প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনের নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান ভূমিকা ছাড়া এই তুঘলকি পরিস্থিতির অবসান হবে কি না, তা নিয়েও গভীর শঙ্কা প্রকাশ করছেন এলাকাবাসী।








Discussion about this post