নিজস্ব প্রতিবেদক :
২০১৯ সালের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে যাদের নাম দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল, জি কে শামীম (গোলাম কিবরিয়া শামীম) ছিলেন সেই তালিকার শীর্ষে।
অস্ত্র, মাদক, মানি লন্ডারিং ও শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া এই যুবলীগ নেতা একসময় নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন ও আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে ব্যক্তি ২০২৩ সালে অর্থপাচার আইনে ১০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত, যাঁর বিরুদ্ধে এখনো প্রায় ২৯৭ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিং মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান—তিনি কীভাবে এত দ্রুত মুক্ত হয়ে আবার প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় হয়ে উঠলেন ?
জামিনের অদৃশ্য দরজা খুলে দিল কারা ?
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অত্যন্ত গোপনে একাধিক মামলায় জামিন ও সাজা থেকে খালাস পেয়ে জি কে শামীমের রাজনৈতিক পুনরুত্থান নতুন করে বিস্ময় তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভা-সমাবেশে অতিথিদের সারিতে তাকে বসে থাকতে দেখা গেছে—যার ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই দৃশ্য ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—
▶ কোন প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ‘ক্যাসিনো সম্রাট’ আবার রাজনীতির মূল স্রোতে প্রবেশ করলেন ?
▶ আদালত কি কারও অদৃশ্য ইশারায় তার জন্য বারবার নমনীয় হয়েছে ?
পুরনো সিন্ডিকেট, নতুন রাজনৈতিক ছক ?
নারায়ণগঞ্জজুড়ে নতুন করে ছড়িয়েছে আরেকটি গুঞ্জন।
অভিযোগ রয়েছে, শামীম ওসমানের ক্যাশিয়ারখ্যাত সালাউদ্দিন—যিনি একসময় অবৈধ ঠিকাদারি ও কমিশন বাণিজ্যের মূল সমন্বয়কারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন—এখনো নেপথ্যে সক্রিয়। নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন জি কে শামীমের সঙ্গে, যেন পুরনো চুক্তি ও সিন্ডিকেট অটুট থাকে।
একসময় অভিযোগ ছিল, গণপূর্ত বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে ১০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ‘ম্যানেজ’ করতেন জি কে শামীম। সেই পুরনো ব্যবসায়িক কাঠামো কি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবার চালু করার পাঁয়তারা চলছে ?
পুরনো অভিযোগ, নতুন অস্বস্তি
জি কে শামীম গ্রেপ্তারের পর আওয়ামী লীগের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন—জি কে শামীম প্রতি মাসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এক কোটি টাকা দিতেন। সে সময় এই বক্তব্য রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ হিসেবে আলোচিত হলেও, আজ জি কে শামীমের বিএনপির কর্মসূচিতে সরব উপস্থিতি সেই পুরনো অভিযোগকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
তাহলে কি প্রশ্নটা এখন আরও গভীর ?
▶ ফ্যাসিবাদী সময়ের ঋণখেলাপিদের মতো কি ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে টিকে যাচ্ছে ?
▶ সন্ত্রাসী ও অপরাধী পুনর্বাসনের অলিখিত চুক্তি কি আবার সক্রিয় ?
রাষ্ট্র কোথায় দাঁড়াবে ?
এর আগেও পিচ্চি হেলালসহ আন্ডারওয়ার্ল্ডের একাধিক শীর্ষ অপরাধীর জামিন ও পুনরুত্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। দেখা গেছে—যাদের ছত্রছায়ায় তারা জামিন পেয়েছে, পরবর্তীতে সেই শক্তির সঙ্গেই মিলেমিশে আবার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণে নেমেছে।
জি কে শামীমের প্রত্যাবর্তন তাই নিছক ব্যক্তিগত ঘটনা নয়—এটি রাষ্ট্রের আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক নৈতিকতার ওপর সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
আজ জনমনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
দেশ কি আবার সেই পুরনো সিন্ডিকেটের দখলে যেতে চলেছে, নাকি এবার সত্যিই জবাবদিহির মুখোমুখি হবে ক্ষমতার নেপথ্যের খেলোয়াড়রা ?
আসছে….
[ডকুমেন্ট-ভিত্তিক অনুসন্ধান সিরিজ (Part–1, Part–2)]








Discussion about this post