মামলা মাথায়, তবু অধরা সেলিম ওসমান
‘পলাতক’ সাবেক এমপি কি দেশেই ? আশ্রয়দাতার অভিযোগে নতুন প্রশ্ন—কার ছায়ায় অদৃশ্য ওসমান সাম্রাজ্যের এই প্রভাবশালী মুখ?
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হত্যাসহ একাধিক মামলায় নাম থাকার অভিযোগ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে তিনি ‘পলাতক’। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর তাকে খুঁজতে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সাবেক সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমানকে গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই—এমন অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশ্ন একটাই—মামলার আসামি হিসেবে অভিযুক্ত হয়েও সেলিম ওসমান কোথায়? আর যদি তিনি দেশেই থাকেন, তাহলে তাকে গ্রেপ্তারে বাধা কোথায়?
জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী এই নেতার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও জুলাই আন্দোলনসংক্রান্ত একাধিক মামলায় সরাসরি নাম থাকার দাবি রাজনৈতিক নেতাদের। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের কাছে তিনি ‘পলাতক’ হিসেবে চিহ্নিত হলেও বিভিন্ন সূত্রে তার খুলনা ও ঢাকায় অবস্থানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি তিনি গোপনে নারায়ণগঞ্জে এসে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ আরও গুরুতর। কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা দাবি করেছেন, নারায়ণগঞ্জের একটি আসনে বিএনপির মনোনীত এক প্রভাবশালী নেতার সহযোগিতা ও আশ্রয়ে সেলিম ওসমান চলাফেরা করছেন। ওই নেতার প্রভাব ব্যবহার করেই তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে নারায়ণগঞ্জে যাতায়াত করছেন এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড দেখভাল করছেন—এমন দাবিও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
‘পলাতক’ যদি দেশে থাকেন, অভিযান কোথায় ?
গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর সেলিম ওসমানকে খুঁজতে ফতুল্লার তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উইজডম অ্যাটায়ার্স লিমিটেডে অভিযান চালায় ফতুল্লা মডেল থানার একটি দল। কিন্তু সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্ন, একবার অভিযানের পর আর কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা গেল না কেন?
তাদের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় নাম আসা অন্যান্য অনেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময় সক্রিয় থাকলেও সেলিম ওসমানের ক্ষেত্রে সেই তৎপরতা রহস্যজনকভাবে শিথিল হয়ে গেছে। ফলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—কোনো অদৃশ্য প্রভাবশালী বলয় কি তাকে সুরক্ষা দিচ্ছে?
মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতা বিভিন্ন সময়ে সেলিম ওসমানকে গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন। তাদের ভাষ্য, মামলায় সরাসরি নাম থাকার অভিযোগের পরও একজন সাবেক সংসদ সদস্য কীভাবে দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন, তার জবাব প্রশাসনকে দিতে হবে।
৫ আগস্টের পর নীরব ‘ওসমান রাজ্য’
গণঅভ্যুত্থানের আগে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ‘ওসমান পরিবার’ ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি নাম। সাবেক এমপি সেলিম ওসমান, তার ভাই শামীম ওসমান এবং প্রয়াত নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানকে ঘিরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা-সমালোচনা ছিল।
সমালোচকদের অভিযোগ, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ওসমান পরিবারের প্রভাব বিস্তৃত ছিল। বিশেষ করে সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, অনুগতদের পদে বসানো, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বহুদিনের।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই দৃশ্যপট বদলে যায়। একসময় যে পরিবারের নাম ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রবল আলোড়ন থাকত, তাদের অনেকেই এখন প্রকাশ্যে নেই। পারিবারিক রাজনৈতিক ঘাঁটি ও ঐতিহাসিক বাড়িগুলোতেও নেমে এসেছে নীরবতা।
শামীম ওসমানকে ঘিরে দেশের বাইরে অবস্থানের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। আজমেরী ওসমানকে ঘিরেও ছবি, ভিডিও ও বার্তা প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু সেলিম ওসমানকে নিয়ে রহস্য আরও গভীর।
তিনি কোথায়—এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।
৭২ ব্যবসায়ী সংগঠন ‘জিম্মি’ রাখার অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তির অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনে সেলিম ওসমানের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। তাদের দাবি, প্রায় ৭২টি ব্যবসায়ী সংগঠন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
সমালোচকদের ভাষ্য, এসব সংগঠনে প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের পরিবর্তে অনুগতদের বসানোর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। ‘নির্বাচন নয়, সিলেকশন’—এমন অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারিত হয়ে আসছে।
২০১০ সালের পর থেকে নারায়ণগঞ্জের বড় বড় ব্যবসায়ী সংগঠনে যারা নেতৃত্বে এসেছেন, তাদের একটি বড় অংশ সেলিম ওসমান ও ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ বলয়ের লোকজন—এমন অভিযোগ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ব্যবসায়ী মহলের একাংশের।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ইয়ার্ন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও হোসিয়ারি সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অতীতে ব্যাপক বিতর্ক ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পাশাপাশি প্রভাব বিস্তার, পদবাণিজ্য, ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ এবং চাঁদা আদায়ের একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে উঠেছিল। এসব অভিযোগে বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বর্তমান ও সাবেক দায়িত্বশীলদের বক্তব্য নিয়ে অভিযোগগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আইনজীবী সমিতি—অভিযোগের বিস্তৃত তালিকা
সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগের পরিধি শুধু ব্যবসায়ী সংগঠনে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দাবি, সদর-বন্দর এলাকার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের পরিচালনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও তার প্রভাব ছিল।
বন্দরে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনাকে কেন্দ্র করেও অর্থ আদায় ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ওপরও দীর্ঘদিন একটি রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব ছিল বলে আইনজীবী মহলের একাংশের অভিযোগ। বর্তমানে ওই সমিতি ‘ওসমানমুক্ত’ হয়েছে বলে তাদের দাবি।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, সেলিম ওসমান ও তার ঘনিষ্ঠ বলয়ের প্রভাবের কারণে অতীতে বহু ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ চাপ ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নারায়ণগঞ্জ ছেড়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের প্রতিটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নেওয়া জরুরি এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত ছাড়া অভিযোগগুলোকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যাচ্ছে না।
ভাইয়ের আসন থেকে সংসদে, এরপর ক্ষমতার বিস্তার
২০১৪ সালে তৎকালীন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য একেএম নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের রাজনীতিতে সামনে চলে আসেন তার ভাই সেলিম ওসমান। পরবর্তী সময়ে তিনি ওই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর পারিবারিক সহানুভূতি, ওসমান পরিবারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থন—সব মিলিয়ে সেলিম ওসমানের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।
সমালোচকদের দাবি, এরপর ব্যবসা, রাজনীতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংগঠনে তার প্রভাব বহুগুণে বিস্তৃত হয়। তাদের অভিযোগ, এই প্রভাব ধরে রাখতে গড়ে ওঠে অনুগতদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক।
‘দালাল চক্র’ কি এখনো সক্রিয়?
৫ আগস্টের পর প্রকাশ্য ওসমান রাজনীতি অনেকটাই স্তব্ধ হলেও সমালোচকদের অভিযোগ, ওসমানীয় প্রভাব পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
বরং আড়ালে থেকে একটি ‘দালাল চক্র’ এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে তাদের দাবি। এই চক্রের সদস্যরা পুরোনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে ওসমান পরিবারের প্রভাবশালী সদস্যদের রক্ষা, সম্পদ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ সংরক্ষণ এবং তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি রাজনৈতিক পরিবারের প্রকাশ্য ক্ষমতা হারানোর পরও যদি তাদের পুরোনো নেটওয়ার্ক প্রশাসন, ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় থাকে, তাহলে সেই নেটওয়ার্কের উৎস ও প্রভাব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সমালোচকদের প্রশ্ন—সেলিম ওসমানকে ঘিরে এই নীরবতা কি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে কাজ করছে আরও শক্তিশালী কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ?
প্রশ্ন প্রশাসনের কাছেই
সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে মামলা, তাকে ঘিরে ‘পলাতক’ থাকার তথ্য, দেশে অবস্থানের দাবি এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ—সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে এখন প্রশ্নের সংখ্যা বাড়ছে।
তিনি যদি সত্যিই দেশের বাইরে থাকেন, তাহলে তার অবস্থান শনাক্তে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
আর যদি তিনি খুলনা, ঢাকা বা নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করেন—যেমনটি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সূত্র দাবি করছেন—তাহলে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান কোথায়?
গত ১৫ ডিসেম্বরের অভিযানের পর দৃশ্যমান তৎপরতা কেন থেমে গেল?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মামলার আসামি হিসেবে অভিযুক্ত একজন প্রভাবশালী সাবেক সংসদ সদস্যকে কি কোনো অদৃশ্য রাজনৈতিক ছাতা সুরক্ষা দিচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন শুধু রাজনৈতিক অঙ্গন নয়, নারায়ণগঞ্জবাসীও জানতে চায়।
একসময় যে ওসমান পরিবারের নাম শুনে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কেঁপে উঠত বলে সমালোচকরা দাবি করেন, সেই পরিবারের এক প্রভাবশালী সদস্য আজ কোথায়—তার উত্তর অজানা। কিন্তু তাকে ঘিরে মামলা, অভিযোগ, গোপন অবস্থান এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের দাবিগুলো ক্রমেই একটি বড় প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে—
‘পলাতক’ সেলিম ওসমান আসলে কার ছায়ায় ?
সম্পাদকের নোট: সেলিম ওসমান ও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে সংযোজন ও প্রকাশ করা হবে।
নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক গুঞ্জন
নগরবাসীর গুঞ্জন থেকে জানা যায়, বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী নগরীর কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা, জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা, ওসমানীয় দালালখ্যাত চিহ্নিত চক্র সর্বাত্মকভাবে সেলিম ওসমানকে রক্ষা করে চলছে গ্রেফতার না করার জন্য।








Discussion about this post