নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ভূমিসদস্যুতা, চর দখণ নদী দখল, বালু ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, জেলা প্রশাসনের রাজস্ব খাত ও ভূমি অধিগ্রহণ শাখা, গণপূর্ত, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ, রাজনীতি, নিয়োগ-বদলি, দরপত্র, অবৈধ গ্যাস চোরাই ব্যবসা, হাসপাতালের ওষুধসহ খাদ্য টেন্ডারবাজি, চোরাই তেলের ব্যবসা, ডিল লাইন, ইন্টারনেট, পোষাক সেক্টরের লুটপাট আর উন্নয়ন প্রকল্প- সবকিছুতেই দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার ভাই আরেক এমপি সেলিম ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, শামীম পুত্র অয়ন ওসমানসহ চেলা চামচারা।
শেখ হাসিনার শাসনামলের পুরো সময়জুড়ে গড়ে ওঠা এই সাম্রাজ্য ভেঙে পড়লেও এর প্রভাব বর্তমানেও রয়েছে অব্যাহত। অসংখ্য মামলার আসামী সাবেক এমপি সেলিম ওসমান পালাতে না পারলেও আর পুরো জেলার অপরাধ সাম্রাজ্যের মূলহোতা শামীম ওসমান রয়েছেন বিদেশে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নারায়ণগঞ্জের ক্ষমতার পাল্লা এখন কার হাতে ?
শামীম ওসমান অর্থাৎ ওসমানীয় সাম্রাজ্য দেখভাল করছে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির একটি শক্তিশালী চক্র। শুধুমাত্র সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিন ছাড়া নারায়ণগঞ্জ বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকেই ওসমানীয় দালালীর ওই চক্রের অংশিদার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের সাথে সাথে গাঢাকা দেয় ওসমানীয় দখলদারদের প্রায় সকলেই। আগুণে জ্বালিয়ে দেয়া হয় শামীম ওসমান, সেলিম ওসমান, আজমেলী ওসমানের বাড়ি গাড়ি। আর জুলাই হত্যাসহ অনেক মামলার আসামি শামীম ওসমান বর্তমানে বিদেশে আয়েশের সাথেই দিনযাপন করছেন পরিবার নিয়ে। তবে তার সব অপকর্মের হোতা টিটুও রয়েছেন পলাতক অবস্থায় ধরা-ছোঁয়ার বাহিরে। গুঞ্জন রয়েছে, বিদেশে পালিয়ে থেকেই নারায়ণগঞ্জের কলকাঠি নাড়ছেন এই শামীম ওসমান – টিটু চক্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৫ বছর আওয়ামীলীগের ক্ষমতাবলে নারায়ণগঞ্জে একক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন ওসমানীয় পরিবার। শামীম ওসমানের নেতৃত্বে সরকারি সকল দপ্তর ছিলো এই ওসমানীয় দখলে।
শামীম – সেলিম – আজমেরী – অয়ন ছাড়াও শ্যালক টিটুর এই সাম্রাজ্যে সরকারি কর্মকর্তা, বিরোধী দল, এমনকি নিজ দলের নেতা-কর্মীরাও ছিলেন অসহায়। ওসমানীয় বিরাগভাজন হয়ে টিকতে পারেন নাই নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি, আওয়ামী লীগের নেতা, এসপি, ডিসি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন পর্যন্ত। আর সিটি করপোরেশনের মেয়র ডাক্তার আইভীও নোঙড়া ভাষাসহ নানাভাবে আক্রমণের শিকার হন। নিজ দলের নেতাকর্মীদের যে কেউ স্বচ্চতার সাথে ওসমানীয় অপরাধের প্রতিবাদ করলে তার অবস্থা কি হয়েছে তার হাজারো প্রমাণ রয়েছে এই নারায়ণগঞ্জবাসীর ভূক্তভোগীদের কাছে ।
গডফাদারখ্যাত শামীম ওসমানের পূর্ব পুরুষের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই নানা চড়াই উৎরাই শেষে শামীম ওসমানের দাদা খান সাহেব ওসমান আলী ও বাবা একেএম সামছুজ্জোহা ছিলেন আওয়ামীলীগরে প্রতিষ্টাতা সদস্য। সেই সূত্র ধরে শামীম ওসমানের দুই ভাই আওয়ামীলীগের সাথে নানা রাজনেতিক চরিতার্থ বিলুপ্ত করে করে জাতীয় পার্টি থেকে এমপি হয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলে। জাতীয় পার্টির শুরু থেকেই অদ্যবদী ওসমান পরিবারের এক ভাই জাতীয় পার্টিতে আরেক ভাই শামীম ওসমান আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থেকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেই যাচ্ছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রেই শামীম ওসমান তিন বার হয়েছেন সংসদ সদস্য। এমপি হওয়ার সুবাদে ভিওআইপি ব্যবসা, জ্বালানী ব্যবসার নাম করে হাজার কোটি টাকা নানা অবৈধ পন্থায় হাতিয়ে নেয় ওই পরিবারের সকলেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওসমানীয় অবৈধ ‘টাকার মেশিন’ ছিলেন সিদ্ধিরগঞ্জের তেল চোরের মূল হোতা কাউন্সিলর মতি ও পুলিশের এক সময়ের সোর্স আশরাফ। এ ছাড়াও সোনারগাঁওয়ের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুমসহ বন্দর উপজেলার সকল ইউপি চেয়ারম্যান, সদর উপজেলার সকল ইউপি চেয়ারম্যান, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহ সভাপতি এম এম রানা ( গণপরিবহনের এক সময়ের হেলপার)।
অবৈধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে নিজ পরিবারের এমপি চাচী সারাহ বেগম কবরীর উপর হামলা করতেও একবিন্দুও চিন্তা করেন নাই শামীম ওসমান। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এমন নগ্ন কর্মকাণ্ড করার পরও শেখ হাসিনা এই গডফাদার কে শাস্তির আওতায় না এনে উল্টো পুরস্কৃত করেন পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের টিকেট দিয়ে।
আর তাতেই গডফাদারের তকমা পুরোপুরি দেখাতে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক তান্ডব চালিয়ে ৫ আগষ্টের পূর্বেই দেশ থেকে পালিয়ে যায় শামীম ওসমানসহ পুরো পরিবার।
আর দেশেই আটকে পরে আরেক ভাই নারায়ণগঞ্জ ব্যবসায়ীদের আতংকের নাম সেলিম ওসমান । যার সাম্রাজ্য এখন বিএনপির নেতাদের সাথে আতাত করে দেখভাল করে যাচ্ছেন বিকেএমইএ এর বিতর্কিত সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, চেম্বার অব কমার্সের সতাপতি দিপু ভূইয়া (যিনি শামীম ওসমানের পুরানো পার্টনার হিসেবে পরিচিত), বিতর্কিত শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ব্যবসায়ী পার্টনার মডেল গ্রপের মাসুদুজ্জামানসহ বিএনপির ডাকসাইটের কয়েকজন নেতা। যারা বিগত সময়ে ওসমানীয় অর্থায়নে নাসিক নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তুমুল দ্বন্দ্বে জড়িয়ে বিতর্কের ঝড় তুলেন।
তারাই এখন ওসমানীয় সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন বলে জোড়ালো অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি প্রায় প্রতি মাসে বিদেশে অবস্থান করে ওসমানীয় গোপন বার্তা আদানপ্রদান করছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।









Discussion about this post