দীর্ঘদিন যাবৎ নারায়ণগঞ্জে গুঞ্জন রয়েছে, “সেলিম ওসমানকে সেল্টার দিচ্ছেন বিএনপি’র একজন প্রার্থী (যার বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট সরকার অন্যতম দোসর হিসেবে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে), ব্যবসায়িক সংগঠন বিকেএমইএ এর মোঃ হাতেমসহ ওসমানীয় দালাল চক্র নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কর্তাদের ম্যানেজ করতেও তৎপর রয়েছেন। একই সাথে বিএনপি’র কয়েকজন নেতাকে ইতিমধ্যে ম্যানেজ করেছেন উল্লেখিত ওসমানীয় দালাল চক্র। যার কারনে সেলিম ওসমান নিজ ব্যবসার প্রতিষ্ঠানে আসা-যাওয়াসহ ঢাকা ও খুলনায় নিয়মিত যাতায়াত করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন। আর এমন ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠায় নাটকীয় অভিযান নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।”
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন :
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে জুলাই হত্যাকাণ্ডে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার আসামি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমানকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে পুলিশের তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সাম্প্রতিক এক অভিযানে তার মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফতুল্লার উইজডম অ্যাটায়ার্স লিমিটেডে পুলিশ অভিযান চালালেও তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পুলিশ বলছে—তিনি দেশে অবস্থান করছেন, তবে আত্মগোপনে রয়েছেন।
অভিযান ও পুলিশের বক্তব্য
সাবেক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানকে গ্রেফতার করতে সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ফতুল্লা মডেল থানার একটি দল উইজডম অ্যাটায়ার্স লিমিটেড কারখানায় অভিযান পরিচালনা করে।
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাম্প্রতিক সময়ে সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করছেন এবং তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যাতায়াত করছেন—এমন আলোচনা চলছিল। তবে গোয়েন্দা তথ্য যাচাইয়ে এ দাবির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আলোচনার সত্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবেই অভিযান পরিচালিত হয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বলেন, সেলিম ওসমান বর্তমানে দেশেই আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবস্থান নিশ্চিত হওয়া মাত্রই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জুলাই হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
গত বছরের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা হামলায় অংশ নেন। হামলার নেতৃত্বে ছিলেন ওসমান পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান।
ওই সময় ধারণ করা ছবি ও ভিডিও ফুটেজে শামীম ওসমান, তার পরিবারের একাধিক সদস্য এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর উপস্থিতির অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শামীম ওসমানসহ তার পরিবারের একাংশ আত্মগোপনে চলে যান। কারও কারও বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার দাবিও সামনে আসে।
সেলিম ওসমানের অবস্থান: দাবি ও পাল্টা দাবি
একাধিক সূত্রের দাবি, সেলিম ওসমান শুরু থেকেই দেশের মধ্যেই অবস্থান করছেন। সরকার পতনের পর তিনি আত্মগোপনে থেকেই ব্যবসায়ী সংগঠন বিকেএমইএ থেকে চিঠির মাধ্যমে পদত্যাগ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করা হয়—সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জের একজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতার আশ্রয়ে থেকে নিয়মিত তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করছেন এবং প্রশাসন বিষয়টি জেনেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
এই অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেলিম ওসমানকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে জনমত আরও জোরালো হয়। তবে পুলিশ বলছে, এ ধরনের দাবির পক্ষে এখনো নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেড় বছরেও গ্রেপ্তার কেন হয়নি—মূল প্রশ্ন
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—জুলাই হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর মামলার আসামি হয়েও সেলিম ওসমান কেন এখনো গ্রেপ্তার হলেন না ? অনুসন্ধানে উঠে আসে কয়েকটি বাস্তবতা:
সরকার পতনের পরপরই শামীম ওসমানসহ পরিবারের একাংশ দেশত্যাগ বা আত্মগোপনে চলে গেলেও সেলিম ওসমান দেশেই অবস্থান করেন।
দৃশ্যত প্রকাশ্যে না থাকলেও ব্যবসায়িক ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত (যেমন বিকেএমইএ থেকে পদত্যাগ) চিঠির মাধ্যমে সম্পন্ন করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক বক্তব্যে তার অবস্থান নিয়ে একাধিক দাবি উঠলেও সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করার মতো তথ্য প্রশাসনের হাতে নেই বলে দাবি পুলিশের।
উপসংহার
সেলিম ওসমানকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো অমীমাংসিত। পুলিশের দাবি অনুযায়ী তিনি দেশে থাকলেও আত্মগোপনে রয়েছেন; অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ জোরালো। এই পরিস্থিতিতে কেবল অভিযান নয়, বরং স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে অবস্থান নিশ্চিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় সেলিম ওসমানসহ সব অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর আইনানুগ পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।









Discussion about this post