নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের রপ্তানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। এই বাস্তবতা একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য তৈরি করছে বড় ধরনের ঝুঁকি। বৈশ্বিক বাজারে সামান্য ধাক্কা এলেই দেশের রপ্তানি আয় চাপে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে রপ্তানি খাতকে বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিয়েছে সরকার।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, কেবল নীতিগত সহায়তা নয়—উদ্যোক্তা তৈরির দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পরিশ্রম, দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।
বৃহস্পতিবার পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি জানান, সরকার ‘এক্সপোর্ট কমপিটিটিভনেস ফর জবস’ প্রকল্পের মাধ্যমে রপ্তানি খাতে বড় ধরনের সংস্কার ও বিনিয়োগ শুরু করেছে। লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশকে পোশাকনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে একটি বৈচিত্র্যময় ও প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি অর্থনীতিতে রূপান্তর করা।
বাণিজ্য উপদেষ্টার মতে, বর্তমান কাঠামো ধরে রেখে ভবিষ্যতের লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না।
এজন্য নন-পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি অন্তত আড়াই গুণ বাড়াতে হবে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, প্লাস্টিক এবং হালকা প্রকৌশল খাতকে তাই অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সারা দেশে চারটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারির ভিত্তিতে পরিচালিত এসব কেন্দ্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি থাকবে কারিগরি প্রশিক্ষণ, পণ্য উন্নয়ন এবং প্রোটোটাইপ তৈরির সুবিধা—যা উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনে সহায়তা করবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) আয়োজিত এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বেসরকারি খাত বিশেষজ্ঞ ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি হোসনে ফেরদৌস সুমি, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক, ড. এম মাসরুর রিয়াজ এবং মো. আব্দুর রহিম খানসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ শুধু লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয় নয়—এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন নীতিগত ধারাবাহিকতা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে বাংলাদেশ শুধু তৈরি পোশাক নয়, অন্যান্য খাতেও বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। আর তাতেই ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা কাগুজে স্বপ্ন নয়, বাস্তব সম্ভাবনায় রূপ নিতে পারে।








Discussion about this post