সোনারগাঁও প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধপ্রবণ জেলা হিসেবে আলোচনায়। মাদক, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতির পাশাপাশি সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে বিষয়টি ক্রমশ প্রকট হচ্ছে, তা হলো অবৈধ অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার। সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের পাঁচানী এলাকায় প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে গুলি করার সাম্প্রতিক ঘটনা সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই আরেকটি জ্বলন্ত প্রমাণ।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বিকেলে সোনারগাঁ উপজেলার পাঁচানী এলাকায় নদীর পাড়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সময় স্থানীয় সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত মাহি ও জিয়াকে প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে গুলি করতে দেখা যায়। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ কার্যক্রমে জড়িত আওয়ামী লীগ নেতা হামিদ আলী গ্রুপ এবং কুরবানপুর এলাকার রাসেল গ্রুপের মধ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই মাহি ও তার সহযোগী জিয়া অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
ভিডিও ভাইরাল ও জনমনে আতঙ্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়—দিনের আলোতে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবাধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন উঠেছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কিভাবে এমন প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া সম্ভব হচ্ছে?
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও অপরাধের যোগসূত্র
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্ত মাহি ও জিয়া একটি রাজনৈতিক গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছে—রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী ছত্রছায়ার কারণে অনেক সন্ত্রাসী অবাধে চলাফেরা করছে। এতে করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
এ ঘটনায় সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিববুল্লাহ জানিয়েছেন, এখনো কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেয়নি এবং ভাইরাল ভিডিওটি যাচাই করা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—অভিযোগ না থাকলেও প্রকাশ্য ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে ভিডিও ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত মামলা ও অস্ত্র উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার: বৃহত্তর চিত্র
নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক ঘটনায় প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহারের নজির পাওয়া গেছে। চোরাচালান রুট, শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক অপরাধ চক্র এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ থামানো যাচ্ছে না। এর ফলে:
# সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে
# আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে
# অপরাধীরা রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী মনে করার সুযোগ পাচ্ছে
অনুসন্ধান ও করণীয়
১. এই প্রেক্ষাপটে গঠনমূলক কিছু পদক্ষেপ জরুরী-
২. ভিডিওভিত্তিক মামলা: ভাইরাল ভিডিওকে প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে নিয়ে দ্রুত মামলা রুজু।
৩. অস্ত্রের উৎস অনুসন্ধান: পিস্তল কোথা থেকে এসেছে—চোরাচালান নাকি স্থানীয় মজুদ—তা খতিয়ে দেখা।
৪. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অভিযান: দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান।
৫. স্থানীয় গোয়েন্দা জোরদার: নিয়মিত নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ বৃদ্ধি।
৬. সামাজিক সচেতনতা: এলাকাবাসীকে ভয়মুক্ত হয়ে তথ্য দেওয়ার পরিবেশ তৈরি।
উপসংহার
সোনারগাঁয়ের পাঁচানী এলাকার এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে—নারায়ণগঞ্জে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যদি এখনই কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া আরও স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা মানেই অপরাধীদের জন্য আরও প্রশ্রয়।








Discussion about this post