নিজস্ব প্রতিবেদক :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি চরম উত্তেজনাকর রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিন দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শেখ মজিবুর রহমানের মনোনয়ন প্রত্যাশা ভেস্তে যাওয়ার পর বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং এর জেরে একের পর এক বহিষ্কারের ঘটনায় স্থানীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা শামীম ওসমানের সঙ্গে শেখ মজিবুর রহমানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা এবং অতীতের বিতর্কিত ভূমিকার কারণেই শেষ পর্যন্ত তিনি দলীয় আস্থা হারান। বিষয়টি এখন শুধু একজন নেতার বহিষ্কারেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে দুই উপজেলার বিএনপি সংগঠনের ভেতরে।
অতীতের ছায়া ও বিতর্কিত ভূমিকা
বিএনপির স্থানীয় একাধিক নেতা জানান, ১৯৯৮ সালে টিপাইমুখ বাঁধবিরোধী লংমার্চ চলাকালে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় শামীম ওসমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল। সে সময় শেখ মজিবুর রহমান নিজে উপস্থিত থেকে শামীম ওসমানের সাথে অংশ গ্রহণ করেন। শামীম ওসমানের অত্যান্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন শেখ মজিবুর রহমান —এমন দাবি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
তাদের ভাষ্য, ওই ঘটনার পরও শেখ মজিবুর রহমান বিএনপির বাজিতপুর উপজেলা সভাপতি পদ দীর্ঘদিন ধরে ধরে রাখতে সক্ষম হন। তবে সময়ের ব্যবধানে দলীয় নেতৃত্বে তার গ্রহণযোগ্যতা কমতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল অর্থ ব্যয় করেও তিনি সেই ‘পুরনো চরিত্রের’ অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি।
মনোনয়ন বদল ও বিদ্রোহ
চলতি নির্বাচনে প্রথমে বিএনপি কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে শেখ মজিবুর রহমানকে মনোনয়ন দিলেও পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দলীয় প্রার্থী করা হয় সৈয়দ এহসানুল হুদাকে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শেখ মজিবুর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে নামেন। এর পরপরই তাঁকে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতির পদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তবে বহিষ্কারেও থামেনি সংকট। শেখ মজিবুর রহমানের পক্ষে প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগে বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলার বিএনপির ১৭ জন নেতাকর্মীকেও দল থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় বিএনপি।
১৭ নেতাকর্মীর বহিষ্কার
গত সোমবার বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে এসব নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বহিষ্কৃতদের মধ্যে রয়েছেন বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, সিনিয়র সহসভাপতি মোস্তুফা আমিনুল হক, দীঘিরপাড় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহরিয়ার শামীম, বলিয়ারদী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফিরোজ খান, নিকলী উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মানিক মিয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিনসহ দুই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারা।
ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া
বহিষ্কৃত নেতারা বলছেন, শেখ মজিবুর রহমানের প্রতি তৃণমূলের সমর্থন উপেক্ষা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির বলেন,“পদ গেলে পদ আসবে, কিন্তু যাকে নেতা মেনে রাজনীতি করেছি, তাকে ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। দুই উপজেলার অধিকাংশ নেতাকর্মী এখন শেখ মজিবুর রহমানের পক্ষে।”
অন্যদিকে বিএনপির দলীয় প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, “দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যারা যাবে, তাদের পদ থাকবে না। প্রয়োজনে আরও বহিষ্কার আসবে।”
শামীম ওসমানের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রে ঘুরে ফিরে আসছে শামীম ওসমানের নাম। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মতে, শামীম ওসমানের সঙ্গে অতীতের সখ্যতা ও বিতর্কিত ঘটনার দায় শেষ পর্যন্ত শেখ মজিবুর রহমানকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করেছে। তাদের দাবি, এই প্রভাবই তাকে ধীরে ধীরে দলীয় মূলধারা থেকে বিচ্যুত করেছে এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী প্রার্থী হতে বাধ্য করেছে।
উপসংহার
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের এই পরিস্থিতি শুধু একটি আসনের নির্বাচন নয়, বরং বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, তৃণমূল বনাম কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত এবং অতীতের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। শামীম ওসমানের প্রভাব নিয়ে ওঠা অভিযোগ, শেখ মজিবুর রহমানের বিদ্রোহ এবং ১৭ নেতাকর্মীর বহিষ্কার—সব মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনে এই আসন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
একই সাথে এই শামীম ওসমানের সাথে সখ্যতার কারণে বিএনপির অনেক নেতাদের অনেকের আম-ছালা সবই গেলো বলেও ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে নারায়ণগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে ।








Discussion about this post