স্টাফ রিপোর্টার :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি ইফতার মাহফিল ঘিরে হঠাৎ বিস্ফোরিত উত্তেজনা কেবল তাৎক্ষণিক কোনো বিরোধ নয়—বরং বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, অভিযোগ এবং এক বিতর্কিত ব্যবসায়ী নেতৃত্বের মুখোশ উন্মোচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো এতদিন চাপা ছিল, তা এবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
ইফতার মঞ্চেই বিস্ফোরণ: “ফ্যাসিস্টের দোসর” বিতর্ক
মঙ্গলবার ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীতে জামায়াতের আয়োজিত ইফতার মাহফিলে ঘটে নাটকীয় ঘটনা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন এবং বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
কিন্তু হাতেমকে মঞ্চে দেখে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন সংসদ সদস্য আল আমিন। একই মঞ্চে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বক্তব্যে সরাসরি বলেন, “আমি ফ্যাসিস্টের দোসরের সাথে এক মঞ্চে বসবো না।”
এই বক্তব্যের পরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হাতেম অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করলেও তার অনুসারীরা এমপিকে ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করে।
প্রশ্ন উঠেছে—একজন ব্যবসায়ী নেতার উপস্থিতি কেন এত তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে ?
অভিযোগের পাহাড় : ক্ষমতার ছায়ায় হাতেমের উত্থান
২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলন চলাকালে শেখ হাসিনার পতনের মাত্র একদিন পূর্বে ৩ আগষ্ট ব্যবসায়ীদের নিয়ে শেখ হাসিনার বৈঠকে জোড়ালো কন্ঠে এই হাতেম আন্দোলনরত ছাত্রদের কঠোর হস্তে দমন করার আহবান জানিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য প্রদান করেন । যা এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। এমন বক্তব্যের একদিন পর শেখ হাসিনার পতন হলে এই হাতেমের গডফাদার শামীম ওসমানসহ ওসমান পরিবার পালিয়ে যায় । আর গা-ঢাকা দেয় হাতেম চক্র। এর কিছুদিনের মধ্যে এই বিতর্কিত হাতেম ও বিতর্কিত মডেল মাসুদ নতুন নাটক মঞ্চায়ন করে বিএনপির নেতাদের চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। এরপর নিজেদের পিঠ বাঁচাতে বিতর্কিত হাতেম ও বিতর্কিত মডেল মাসুদ ছাত্রনেতা সারজিস আলমকে ৫০ লাখ টাকার চেক দিয়ে নতুন নতুন নাটক মঞ্চায়ন করেই যাচ্ছেন। আর এমন নাটকের কারণে বিতর্কিত হাতেম ও বিতর্কিত মডেল মাসুদ নানাভাবে নাজেহাল হলেও ওসমানীয় দালাল ও আওয়ামীলীগের দোসর এই চক্র নানাভাবে নিজেদের বিগত সময়ের লুন্ঠিত সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে কিছু মুখপাত্রদের ম্যানেজ করে আলোচনায় থাকতে নানা কৌশল চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, বিতর্কিত মোহাম্মদ হাতেম ও বিতর্কিত মডেল মাসুদ সাধারণ ব্যবসায়ী নন; বরং দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের আশ্রয়ে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের অন্যতম অপরাধী শামীম ওসমান, সেলিম ওসমান, আজমেরী ওসমান ও অয়ন ওসমানের মতো কুখ্যাত অপরাধীদের পদলেহন করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন এই বিতর্কিত হাতেম ও বিতর্কিত মডেল মাসুদ । রাজনৈতিক পরিবারের ঘনিষ্ঠ হয়ে তিনি শিল্পখাতে প্রভাব বিস্তার করেন এবং সেই প্রভাব ব্যবহার করে সংগঠনের নেতৃত্ব ধরে রাখেন নানা কৌশলে।
এমনকি ব্যবসায়ী সংগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ ধরে রাখতে রাজনৈতিক আনুগত্যই ছিল তার প্রধান শক্তি—এমন কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিতর্কিত বক্তব্য : পতনের আগের দিনই ‘শেষ বাজি’ ?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও গুরুতর অভিযোগ। ক্ষমতাসীন সরকারের পতনের ঠিক আগের দিন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে হাতেমের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে এখনও বিতর্ক থামেনি।
অভিযোগ, ওই বৈঠকে তিনি কঠোর দমন-পীড়নের আহ্বান জানান, যা পরবর্তীতে জনরোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল ক্ষমতার শেষ মুহূর্তে অবস্থান রক্ষার মরিয়া চেষ্টা—যা উল্টো তার বিরুদ্ধে জনমতকে আরও ক্ষুব্ধ করে।
পতনের পর ‘বেঁচে থাকার রাজনীতি’: পাল্টে যায় আনুগত্য ?
সরকার পরিবর্তনের পর হাতেমের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে—
# তিনি দ্রুত রাজনৈতিক অবস্থান বদলানোর চেষ্টা করেন
# বিভিন্ন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন
# নিজের পদ ও প্রভাব ধরে রাখতে অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে
যদিও এসব অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবে একাধিক সূত্র একই ধরনের তথ্য দেওয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইফতার বিতর্ক : ক্ষোভের প্রকাশ নাকি পরিকল্পিত প্রতিক্রিয়া ?
সাম্প্রতিক ইফতার মাহফিলের ঘটনাকে অনেকেই দেখছেন ‘সঞ্চিত ক্ষোভের বিস্ফোরণ’ হিসেবে।
একজন সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে একজন ব্যবসায়ী নেতাকে “ফ্যাসিস্টের দোসর” বলছেন—এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং একটি বড় ধরনের অভিযোগের ইঙ্গিত।
অন্যদিকে, হাতেমের অনুসারীদের তাৎক্ষণিক ঘেরাও ও বিক্ষোভ প্রশ্ন তুলছে—
এটি কি স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া, নাকি পূর্বপ্রস্তুত শক্তি প্রদর্শন ?
প্রশাসনের নীরবতা ও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা
ঘটনার সময় দ্রুত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও, দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রশাসন অনেক সময় নীরব থাকে, যা এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখে।
মূল প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত
এই পুরো ঘটনার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
# মোহাম্মদ হাতেমের রাজনৈতিক সংযোগ কতটা গভীর?
# ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব ধরে রাখতে তিনি কী ধরনের প্রভাব ব্যবহার করেছেন?
# সরকারের পতনের আগে তার বক্তব্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল?
# সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কি তার বিরুদ্ধে জমে থাকা অভিযোগের বহিঃপ্রকাশ?
উপসংহার : মুখোশের আড়ালে বাস্তবতা ?
ফতুল্লার এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে—ব্যবসা, রাজনীতি এবং প্রভাবের অস্বচ্ছ সম্পর্ক এখন আর আড়ালে নেই।
মোহাম্মদ হাতেমকে ঘিরে যে বিতর্ক, তা কেবল একজন ব্যক্তির নয়—বরং একটি ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা।
এখন সময় এসেছে—এই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্য উন্মোচনের। নাহলে এমন বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয়ে সমাজে অস্থিরতা বাড়াবে।









Discussion about this post