নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ নগর উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ। নাগরিক সংগঠন ‘আমার নারায়ণগঞ্জ’ এর ব্যানারে রাজকীয় ইফতার মাহফিল করে “সুন্দর নারায়ণগঞ্জ গড়ার” পরিকল্পনার কথা বললেও নগর পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রধান দুই ব্যক্তি—নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ এডভোকেট আবুল কালাম ও সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।
যার কারণে গত দুই দিন নারায়ণগঞ্জ মহানগরীতে চলছে ব্যাপক সমালোচনা – আগুন ও বিতর্ক ।
এতে নগরজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে— এটি কি সত্যিকারের নগর উন্নয়নের উদ্যোগ, নাকি শুধুই প্রচারণা আর স্ট্যান্ডবাজির নতুন অধ্যায় ?
রাজনৈতিক মহল ও সচেতন নাগরিকদের মতে, যাদের হাতে নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষমতা ও দায়িত্ব রয়েছে, তাদের বাদ দিয়ে উন্নয়নের আলোচনা করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি অসংগত। ফলে মাসুদুজ্জামানের এই আয়োজনকে অনেকেই “ইফতারের টেবিলে নগর উন্নয়নের নাটক” বলেই আখ্যা দিচ্ছেন।
বাস্তব কাজের মাঠে কালাম–সাখাওয়াত, আলোচনায় মাসুদের পরিকল্পনা
সূত্র বলছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব নেন এডভোকেট আবুল কালাম। আর ২৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পান এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তারা যৌথভাবে নগর উন্নয়নের নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন।
যানজট নিরসনে অটো-মিশুক নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল নম্বর প্লেট চালুর উদ্যোগ, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চৌকি-ভ্যান বন্ধের ঘোষণা, ঈদের পর কঠোর অভিযান চালানোর প্রস্তুতি—এসব পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছে।
পাশাপাশি ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খনন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করছেন সিটি প্রশাসক।
বিশেষ করে দখলের মুখে থাকা গঞ্জে আলী খাল পুনঃখনন করে জলাবদ্ধতা নিরসনে নজির স্থাপন করেছেন প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। অন্যদিকে বন্দরে বৈধ গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করতে গভীর পাইপলাইনের কাজ শুরু করেছেন এমপি আবুল কালাম।
অর্থাৎ বাস্তব উন্নয়নের কাজ যখন মাঠে এগোচ্ছে, তখনই হঠাৎ করে এমপি ও প্রশাসককে বাদ দিয়ে নগর উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরায় অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক নাটক বা ব্যক্তিগত প্রচারণা হিসেবেই দেখছেন।
ক্লাবের ইফতার, নগর উন্নয়নের ‘স্ট্যান্ডবাজি’ ?
নগরবাসীর একাংশ বলছেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হলে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ। কিন্তু মাসুদুজ্জামানের আয়োজনটি ছিল মূলত একটি ক্লাবভিত্তিক ইফতার পার্টি, যেখানে বক্তৃতা ও আলোচনা হলেও বাস্তব কোনো পরিকল্পনা বা রূপরেখা সামনে আসেনি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে— নারায়ণগঞ্জকে সুন্দর করার পরিকল্পনা কি সত্যিই ছিল, নাকি সেটি ছিল শুধুই প্রচারের কৌশল ?
পুরনো বিতর্কের ছায়া
মাসুদুজ্জামান মাসুদের রাজনৈতিক পথচলাও নানা বিতর্কে ঘেরা। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হয়ে আলোচনায় আসেন। কিন্তু পরবর্তীতে নানা সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে সেই পদ থেকেও সরে দাঁড়াতে হয় তাকে।
একইভাবে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো নিয়েও তাকে ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলের অনেকেই তখন তাকে “স্ট্যান্ডবাজির রাজনীতির উদাহরণ” বলে মন্তব্য করেছিলেন।
এছাড়া ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সাবেক আইনমন্ত্রীর ভিসা সংক্রান্ত অর্থ লুটপাটের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন আকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
ইফতার মাহফিল ঘিরে নতুন গুঞ্জন
এমন বিতর্কের মাঝেই ‘আমার নারায়ণগঞ্জ’ ব্যানারে ইফতার মাহফিল করে নগর উন্নয়নের পরিকল্পনা ঘোষণা করায় নতুন করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
অনেকের মতে, বাস্তব উন্নয়ন হয় প্রশাসনিক উদ্যোগ, নীতিগত সিদ্ধান্ত ও মাঠপর্যায়ের কাজের মাধ্যমে—ক্লাবের ইফতার পার্টিতে বক্তৃতা দিয়ে নয়।
নগরবাসীর ভাষায়,
“যারা শহর চালাচ্ছেন তাদের বাদ দিয়ে উন্নয়নের কথা বলা মানে বাস্তবতা এড়িয়ে প্রচারণা চালানো। এতে শহরের সমস্যার সমাধান নয়, বরং নতুন বিভ্রান্তি তৈরি হয়।”
ফলে এখন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
‘আমার নারায়ণগঞ্জ’ কি সত্যিই নগর উন্নয়নের প্ল্যাটফর্ম, নাকি এটি শুধুই মাসুদুজ্জামান মাসুদের নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ ?








Discussion about this post