নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেতা আব্দুল্লাহ আল আমিনের সাথে একই মঞ্চে দেখা গেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি, গোগনগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. রুবেল ওরফে রুবেল মেম্বারকে।
একাধিক হত্যা মামলা ও নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত এই ব্যক্তির সাথে একজন সংসদ সদস্যের একই মঞ্চে উপস্থিতি ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সাবেক এমপি শামীম ওসমান ও তার পুত্র অয়ন ওসমানের নেতৃত্বে আন্দোলনকারীদের উপর সশস্ত্র হামলায় সরাসরি অংশ নেন রুবেল মেম্বার।
ওই ঘটনায় গার্মেন্ট শ্রমিক মিনারুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। পরবর্তীতে দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় রুবেলকে আসামি করা হলে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
সম্প্রতি জামিনে বের হয়ে আবারও প্রকাশ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে তাকে।
জানা গেছে, গত ১১ মার্চ সদর উপজেলার সৈয়দপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিনের পেছনে একই মঞ্চে বসে থাকতে দেখা যায় রুবেল মেম্বারকে।
ওই অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মো. জামাল হোসাইন এবং মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি অমিত হাসান।
এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—যে ব্যক্তি ছাত্র আন্দোলনে গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামি, তার উপস্থিতি কি একজন সংসদ সদস্যের অজানা থাকতে পারে ? নাকি রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে বিতর্কিতদের সঙ্গেই আপসের রাজনীতি চলছে ?
স্থানীয় সূত্র জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গত ২০ জুলাই সাবেক এমপি শামীম ওসমান, তার পুত্র অয়ন ওসমানসহ প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ জন সশস্ত্র সমর্থক নিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে মাঠে নামেন রুবেল মেম্বার।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তারা আগ্নেয়াস্ত্র, শটগান, পিস্তল, তলোয়ার, রামদা ও চাপাতিসহ দেশি-বিদেশি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায় এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতে ঘটাতে অগ্রসর হয়। এ সময় আদমজী রোডের আল আমিন নগর পাওয়ার হাউজের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন গার্মেন্ট কর্মী মিনারুল ইসলাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রুবেল মেম্বার দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী অপরাধচক্র গড়ে তুলেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন এমপি শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান এবং অন্যান্য প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠ আশ্রয়ে থেকে সে এসব অপকর্ম চালিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া গোগনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ফজর আলীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও পরিচিত রুবেল মেম্বার। স্থানীয়দের দাবি, ফজর আলীর রাজনৈতিক আশ্রয়েই ইউনিয়নে তার প্রভাব বিস্তার ঘটে এবং পরবর্তীতে তাকে প্যানেল চেয়ারম্যানও করা হয়।
বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি হয়ে ফজর আলী বিদেশে পলাতক থাকলেও তার গড়ে তোলা প্রভাব বলয় ধরে রেখে এলাকায় সক্রিয় রয়েছে রুবেল গং।
অভিযোগ রয়েছে, করোনা মহামারির সময় এমএ ব্যাপারী ডকইয়ার্ডের মালিক আহাম্মদ বেপারীর মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম ঘটে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ফজর আলী নামমাত্র মূল্যে প্রায় পাঁচ একর জমি ভাড়া নিয়ে সেখানে প্রভাব খাটান। পরে তার সহযোগী রুবেল মেম্বার, আনছার ও রবিন মিলে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের দুটি জাহাজসহ বিভিন্ন মালামাল জোরপূর্বক দখলে নেয়।
এই ঘটনায় ওয়ারিশদের সাথে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি মীমাংসার জন্য এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি দৌলত মেম্বারের কাছে বিচার দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই বিরোধ থেকেই ২০২২ সালের ২৬ জুন রাতে দৌলত মেম্বারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও রুবেল মেম্বারের নাম উঠে আসে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
দৌলত মেম্বারের পরিবারের অভিযোগ, মামলা করার পর থেকেই বিভিন্ন সময় তাদের হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে।
এমনকি গত ৫ আগস্ট দৌলত মেম্বারের ছেলে ফয়সালের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্রাট কন্সট্রাকশন অফিসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় রুবেল গং।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—একাধিক হত্যা মামলার আসামি, সন্ত্রাস, দখলবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তিকে নিয়ে কেন একজন সংসদ সদস্যের একই মঞ্চে বসতে হলো? এতে কি অপরাধীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া হচ্ছে না ?
এ ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
অনেকেই বলছেন, মুখে আওয়ামী লীগের দোসরদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও বাস্তবে তাদের সাথেই মঞ্চ ভাগাভাগি করার ঘটনা রাজনীতির দ্বিচারিতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।









Discussion about this post