নারায়ণগঞ্জ এসপি নিয়ে গোপন প্রতিবেদন: রাজনৈতিক ট্যাগে বিতর্ক, পেশাদারিত্বে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
পুলিশ সুপারদের (এসপি) রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রস্তুত করা গোপনীয় একটি প্রতিবেদন ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার এসপিদের রাজনৈতিক অবস্থান, পদোন্নতি এবং অতীত কর্মজীবনের বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
ইতোমধ্যে এই প্রতিবেদন সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এর ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদলও শুরু হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ জেলার বর্তমান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীকে আওয়ামীপন্থি এবং আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, তিনি আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত এবং কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২৫তম বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে উখিয়া সার্কেলে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, র্যাব ও পিবিআইতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া নোয়াখালী ও পঞ্চগড় জেলার এসপি হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে দেশের ৬৪ জেলার এসপিদের রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ১৬ জন বিএনপিপন্থি, ৩২ জন জামায়াতপন্থি এবং আওয়ামী ও মধ্যমপন্থি হিসেবে ৮ জন করে মোট ১৬ জন এসপি দায়িত্বে ছিলেন। এতে স্পষ্ট হয়, মাঠ প্রশাসনে রাজনৈতিক বিভাজন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান সরকারের আমলে ইতোমধ্যে সিলেট, ময়মনসিংহ, জামালপুর, হবিগঞ্জ, বরিশাল, বগুড়া, মাগুরা, মাদারীপুর ও খাগড়াছড়িসহ নয় জেলায় এসপি পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে এ পদায়ন নিয়ে পুলিশের অভ্যন্তরে কিছু অসন্তোষও রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপিপন্থি হিসেবে চিহ্নিত দুই কর্মকর্তার পদায়ন না হওয়ায় ক্ষোভের কথা শোনা যাচ্ছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ ধরনের রাজনৈতিক ট্যাগিং বাহিনীর পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের প্রধান শক্তি হওয়া উচিত নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা।
এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, “আমি একটি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাই না। তবে বিষয়টি দলীয় ফোরামে আলোচনা করা প্রয়োজন।”
অপরদিকে সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা স্পষ্টভাবে বলেন, “প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। পদায়নের ক্ষেত্রে একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত মেধা, যোগ্যতা ও সততা। বর্তমান পদ্ধতিতে তালিকা তৈরি ও পদায়ন প্রভাবিত বলে মনে হচ্ছে।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সময়ে দায়িত্বে থাকা এসপিদের আমলনামা সংগ্রহ করে তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই গোপনীয় প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) খোন্দকার নজমুল হাসান জানান, “জেলায় কর্মরত এসপিদের বিষয়ে সার্বিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। মূল্যায়নের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে আরও পরিবর্তন আসতে পারে।”
এদিকে নারায়ণগঞ্জে এ প্রতিবেদন ঘিরে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তীব্র হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়নের পরিবর্তে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়া না হলে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্লেষণ:
নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে পুলিশের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের বিতর্ক ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কার্যক্রমে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।









Discussion about this post