বিশেষ প্রতিবেদন :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা বিসিক শিল্পনগরী এখন আর কেবল শিল্পাঞ্চল নয়—এটি যেন পরিণত হয়েছে দখল, সিন্ডিকেট আর সংঘর্ষের এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রে।
আর এই অরাজকতার কেন্দ্রে বারবার উঠে আসছে একটি নাম—বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
অভিযোগ উঠেছে, তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত ‘ঝুট বণ্টন’ ব্যবস্থাই বিসিককে ঠেলে দিয়েছে সংঘাত, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার গভীর খাদে।
সরকার পরিবর্তনের পর যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আশা করেছিলেন ব্যবসায়ীরা, সেখানে বাস্তবতা হয়েছে সম্পূর্ণ উল্টো।
অভিযোগ রয়েছে, যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নয়—বরং রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বিএনপি-জামায়াত সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের হাতে ঝুট সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়েছে। টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে এই বণ্টন প্রক্রিয়া কার্যত পরিণত হয়েছে ‘লুটের লাইসেন্সে’।
‘টোকেন বাণিজ্য’ না কি চাঁদাবাজির নতুন রূপ ?
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বিসিকের শত শত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ঝুট, সুতা, কার্টনসহ ওয়েস্টেজ পণ্যের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হাতেম গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
অভিযোগ আরও ভয়াবহ—এই সিন্ডিকেট পরিচালনায় সামনে আনা হয়েছে তার নিজের ছেলে হাসিন আরমান (অয়ন)-কে।
যে কোনো ব্যবসায়ীকে ঝুট বা সংশ্লিষ্ট ব্যবসা করতে হলে দিতে হচ্ছে প্রায় ২৫ শতাংশ ‘কমিশন’। এই অঘোষিত চাঁদাবাজি এখন শিল্পাঞ্চলের ‘খোলা গোপন সত্য’।
দুই গ্রুপ, এক বিসিক—সংঘর্ষের আগুনে জ্বলছে শিল্পাঞ্চল
ঝুট সেক্টর বণ্টনে বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্বের কারণে বিসিকে তৈরি হয়েছে অন্তত দুটি শক্তিশালী গ্রুপ। বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন অংশে বিভক্ত এই গ্রুপগুলো এখন প্রায় প্রতিদিনই জড়িয়ে পড়ছে সংঘর্ষে।
গত ৯ এপ্রিল চাঁদনী হাউজিং এলাকায় বেস্ট স্টাইল কম্পোজিট লিমিটেডকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ছিল তারই ভয়াবহ উদাহরণ।
গুলি, ককটেল, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এলাকা। গুলিবিদ্ধ হন পথচারীসহ নিরীহ মানুষ—যা প্রমাণ করে এই সংঘাত আর কেবল ‘দলীয় আধিপত্যে’ সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
পুরনো দখলদার, নতুন রূপ—অভিযোগের পাহাড়
ব্যবসায়ী মহলের অনেকেই বলছেন, হাতেম নতুন কেউ নন—তিনি আগের সরকারের সময় থেকেই ওসমান পরিবারের ছত্রছায়ায় ঝুট ব্যবসা, জমি দখল ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন।
বর্তমানে শুধু রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ‘মাস্টার বদলেছে’, কিন্তু পদ্ধতি একই রয়ে গেছে—বরং আরও বেপরোয়া হয়েছে।
শ্রমিক অসন্তোষেও ‘ঝুট রাজনীতি’
শুধু ব্যবসায়ী বা নেতাকর্মী নয়, শ্রমিকরাও এই দখলদারিত্বের শিকার। অভিযোগ রয়েছে, ঝুট ফ্যাক্টরি বাড়ানোর প্রলোভনে শ্রমিক অসন্তোষকে ইন্ধন দেওয়া হয়েছে, এমনকি শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার।
শিল্পাঞ্চলের উৎপাদনশীল পরিবেশ ধ্বংস করে এই ‘ঝুট রাজনীতি’ এখন পুরো খাতকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
চারদিক থেকে চাপ, তবুও নীরব হাতেম
হাতেমের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরনো রাজনৈতিক অবস্থান, বিতর্কিত ভিডিও ও ক্ষমতা দখলের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লেও তার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।
বরং অভিযোগ উঠছে—তিনি এখনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক আশ্রয়ে নিজ অবস্থান টিকিয়ে রেখেছেন।
বিশ্লেষণ : বিসিকে ‘অভিশাপ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঝুট বণ্টন
সুশীল সমাজের মতে, বিসিকের বর্তমান অস্থিরতার মূল কারণ একটাই—অস্বচ্ছ, পক্ষপাতদুষ্ট ও সিন্ডিকেটনির্ভর ঝুট বণ্টন ব্যবস্থা।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের নেতারাও বলছেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই দখলদারিত্ব ভাঙতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
শেষ কথা
ফতুল্লা বিসিক আজ এক ভয়ঙ্কর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শিল্পের বদলে এখানে এখন ‘ঝুটের রাজনীতি’, উৎপাদনের বদলে ‘সংঘর্ষের হিসাব’।
আর এই অচলাবস্থার কেন্দ্রে থাকা মোহাম্মদ হাতেমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—তিনি কি একজন সংগঠক, নাকি
বিসিকের অস্থিরতার মূল কারিগর ?
সরকার দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে, বিসিক শিল্পাঞ্চল যে কোনো সময় আরও বড় সংঘাতের বিস্ফোরণে কেঁপে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।









Discussion about this post