স্টাফ রিপোর্টার
নারায়ণগঞ্জে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে।
দলের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে উঠে এসেছে বিস্ফোরক সব অভিযোগ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জেলা সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান।
দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহচর মাওলানা হারুন অর রশিদ এবার তার বিরুদ্ধেই মুখ খুলে দিয়েছেন, দিয়েছেন একের পর এক গুরুতর অভিযোগ।
১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় আমেলা বৈঠকে ফেরদাউসুর রহমানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন নারায়ণগঞ্জের প্রায় ৭০ জন নেতা-কর্মী।
অভিযোগপত্রে সংযুক্ত করা হয় বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ, পত্রিকার কাটিং ও আলোকচিত্র। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় কেন্দ্রীয়ভাবে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাদের ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে মাওলানা হারুন অর রশিদ সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, প্রায় দুই দশকের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সংগঠনের স্বার্থে এতদিন নীরব ছিলেন তিনি। কিন্তু এখন “বিবেকের তাড়নায়” মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন।
তার দাবি, র্যাবের সাবেক বিতর্কিত কারাগারে বন্দি কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিনের সোর্স হিসেবে কাজ করে ফেরদাউসুর রহমান তথ্য সরবরাহ করতেন, যার মাধ্যমে ২০২১ সালে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীসহ বহু আলেমকে গ্রেপ্তার করানো হয়।
শুধু তাই নয়, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক আলেম গ্রেপ্তারের পেছনেও তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হারুন আরও দাবি করেন, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনির কাসেমীর পোলিং এজেন্ট তালিকা প্রতিপক্ষ শামীম ওসমানের কাছে অর্থের বিনিময়ে সরবরাহ করেন ফেরদাউসুর। নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের অভিযোগও তোলেন তিনি।
সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরা হয় বৈঠকে।
অভিযোগ করা হয়, ফেরদাউসুর রহমান একদিকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ভান করলেও, গোপনে একাধিক প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠক করে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। এমনকি দলীয় প্রার্থীকে পরাজিত করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত বৈঠকও করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
বৈঠকে এসব অভিযোগ উপস্থাপনের সময় ফেরদাউসুর রহমানকে নীরব ও মাথা নিচু করে থাকতে দেখা যায় বলে উপস্থিত নেতারা জানান।
এদিকে, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, শৃঙ্খলাভঙ্গ ও গোপন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরা ইতোমধ্যে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
একাধিকবার সম্মেলন আয়োজনকে ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, এমনকি মুখোমুখি অবস্থানও নিয়েছেন উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা।
বিশেষ করে ৯ এপ্রিল হীরা কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত একটি বিতর্কিত কর্মী সম্মেলনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জেলা নেতাদের বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত সম্মেলনটি পণ্ড হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনের নিয়ম ভেঙে একতরফাভাবে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছিল।
দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের শোকজ করেছে এবং বিতর্কিত সকল কার্যক্রম স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনো অস্থির, এবং যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে—জমিয়তের নারায়ণগঞ্জ শাখায় দ্বন্দ্ব এখন আর অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রীতিমতো সাংগঠনিক অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনই এখন নির্ধারণ করবে, অভিযোগের ভারে অভিযুক্ত নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেবে।









Discussion about this post