নারায়ণগঞ্জে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ঘিরে যে বিস্ফোরক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন শুধু সাংগঠনিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই—বরং ভয়াবহ অভিযোগ, গোপন আঁতাত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের এক অন্ধকার চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমানে কারাবন্দী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) আলেপ উদ্দিন।
একটি মাত্র ছবি ব্যবহার করে নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভয়ংকর অপরাধ কর্মকাণ্ড—গুম, খুন ও নির্যাতনের মতো অভিযোগে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল পদে থেকেও তিনি ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এক ধরনের অঘোষিত আতঙ্কের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই আলেপ উদ্দিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার অভিযোগ উঠেছে মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি জমিয়তের কেন্দ্রীয় আমেলা বৈঠকে এই সম্পর্ক নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করেন তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মাওলানা হারুন অর রশিদ।
প্রায় দুই দশকের সম্পর্কের সাক্ষী হয়ে তিনি দাবি করেন—ফেরদাউসুর রহমান সরাসরি আলেপ উদ্দিনের ‘সোর্স’ হিসেবে কাজ করতেন এবং তার মাধ্যমে শতাধিক আলেম-ওলামাকে গ্রেপ্তারের পেছনে ভূমিকা রাখেন।
হারুনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর গ্রেপ্তারের পেছনেও ফেরদাউসুর রহমানের তথ্য সরবরাহ ছিল।
শুধু তাই নয়, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিনিময়ে তিনি বিভিন্ন সুবিধাও নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়। বারবার সতর্ক করার পরও ফেরদাউসুর রহমান এসব কার্যক্রম থেকে সরে আসেননি বলে জানান তিনি।
অভিযোগ এখানেই থেমে নেই। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ফেরদাউসুর রহমানের বিরুদ্ধে গুরুতর বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। বলা হয়, প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে তিনি নিজ দলের প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট তালিকা ফাঁস করেন। নিয়মিত শামীম ওসমানের বাসায় গিয়ে তথ্য আদান-প্রদানের কথাও উঠে এসেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগটি আসে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে।
২০২৬ সালের নির্বাচনের সময় ফেরদাউসুর রহমান প্রকাশ্যে এক প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিলেও গোপনে বিরোধী প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করে আর্থিক সুবিধা নিতেন বলে দাবি করা হয়।
এমনকি এক বৈঠকে তিনি নিজেই শপথ করান যাতে মনির কাসেমী কোনোভাবেই বিজয়ী হতে না পারেন—কারণ তার অতীত কর্মকাণ্ড ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এই সব অভিযোগ উপস্থাপনের সময় ফেরদাউসুর রহমান নীরব থাকেন, যা উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে আরও সন্দেহ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে ৭০ জন নেতাকর্মী অনাস্থা প্রস্তাব দিয়েছেন এবং কেন্দ্রীয়ভাবে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জেলা ও মহানগর জমিয়তের ভেতরে দ্বন্দ্ব এখন চরমে পৌঁছেছে। নেতৃত্বের বিভক্তি, গোপন সম্মেলন আয়োজন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্য এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ—সব মিলিয়ে সংগঠনটি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক পক্ষের কর্মসূচি অন্য পক্ষের বাধায় পণ্ড হচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি।
বিশেষ করে হীরা কমিউনিটি সেন্টারে গোপন কর্মী সম্মেলন আয়োজনের চেষ্টা ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, তা সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নিতে পারত। শেষ মুহূর্তে আয়োজকদের পিছু হটার ফলে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো গেলেও পরিস্থিতি এখনও অস্থির।
সামগ্রিক চিত্রে স্পষ্ট—নারায়ণগঞ্জে জমিয়তের অভ্যন্তরীণ সংকট এখন কেবল রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক নয়; বরং তা জড়িয়ে গেছে গুরুতর অপরাধ, বিশ্বাসঘাতকতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এই সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে তার আগেই প্রশ্ন উঠেছে—এত গুরুতর অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংগঠনের নৈতিক অবস্থান কোথায় দাঁড়িয়ে আছে ?









Discussion about this post