ফতুল্লা (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে যাচ্ছে। অবৈধ অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার, প্রকাশ্যে গোলাগুলি, খুন-অপহরণ ও মাদক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে পুরো এলাকা এখন কার্যত অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
গুলিবর্ষণ করে হতাহতের ঘটনায় আসামিরা প্রকাশ্যে সবার সমাবেশ মিছিল করছে চালাচ্ছে রাম রাজত্ব। এমন ঘটনা পুলিশের নাকের ডগায় ঘটলেও পুলিশ যেন নিশ্চুপ অবস্থানে রয়েছে।
অথচ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, নারী মাদক ব্যবসায়ী বিলকিসের ক্যাডার সাগর একটি পিস্তলের ম্যাগাজিন খুলে গুলি বের করে গুনছে।
প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও এ ধরনের দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে—অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, “এখন আর গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই অস্ত্রের মহড়া চলছে।”
ফতুল্লার ইসদাইর বাজার ও চাষাঢ়া রেলস্টেশন এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই মাদকের বড় ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নিতে একের পর এক সংঘর্ষ, খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ৭-৮টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
এখনও অপহরণের পর নিখোঁজ রয়েছেন মোবারক ও নজরুল নামে দুই ব্যক্তি। প্রতিটি ঘটনাই ছিল আলোচিত, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে।
সূত্র জানায়, এই মাদক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একসময় সীমা ও রাজ্জাকের দ্বন্দ্বে একাধিক প্রাণহানি ঘটে। সর্বশেষ রাজ্জাক বাহিনীর হাতে রায়হান বাবুর্চি ও শুভ হত্যার ঘটনা এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়ায়। প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনায় রানা ও অন্তর নামে দুই যুবক গুলিবিদ্ধ হন।
এমনকি গুলির আঘাতে পথচারী প্রাণী পর্যন্ত রক্ষা পায়নি।
বর্তমানে রাজ্জাক গ্রেফতার থাকলেও ওই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন বিলকিস, যিনি নিজেও হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
তারপরও মাদক ব্যবসা বন্ধ হয়নি—বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে অভিযোগ।
শুধু মাদক নয়, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অস্ত্রের ব্যবহারও বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। গত ১২ এপ্রিল পঞ্চবটি চাঁদনী হাউজিং এলাকায় একটি গার্মেন্টসের বুটির বিরোধকে কেন্দ্র করে যুবদলের দুই গ্রুপ দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে সংঘর্ষে জড়ায়।
এ সময় গোলাগুলিতে মাদ্রাসা ছাত্র এমরান ও বিএনপি নেতা খোকার ছেলে রাকিব গুলিবিদ্ধ হন।
এরপর ১৯ এপ্রিল রাতে কুতুবপুর পশ্চিম রসুলপুর ভাঙ্গারপুল এলাকায় ডিবি পরিচয়ে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী সুমনকে অপহরণের চেষ্টা চালায়।
স্থানীয়দের সন্দেহ হলে তারা ধাওয়া দেয়। এ সময় সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে অন্তত ৪ জন গুলিবিদ্ধ হন। একজনকে আটক করা হলেও মূল অস্ত্রধারীরা পালিয়ে যায়—এখনও তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ফতুল্লা এখন কার্যত ‘অপরাধের অভয়ারণ্য’-এ পরিণত হয়েছে।
ফতুল্লা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আব্দুর রহিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এলাকায় কোনো নিরাপত্তা নেই। মানুষ প্রতিনিয়ত আতঙ্কে বসবাস করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।”
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম স্বীকার করেছেন, প্রবেশপথগুলো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অভিযান সফল করা কঠিন। তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—কতদিনে বাস্তবে দৃশ্যমান হবে এই উদ্যোগ? স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, এখনই প্রয়োজন কঠোর ও টার্গেটেড অভিযান।
অন্যথায় ফতুল্লা খুব দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।









Discussion about this post