স্টাফ রিপোর্টার :
২৭ এপ্রিল। নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনার ১২ বছর পূর্ণ হলো। ২০১৪ সালের এই নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশের বিচার ব্যবস্থায় দ্রুততার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করলেও পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগের দীর্ঘসূত্রতায় চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। নিহতদের পরিবার, আইনজীবী ও সচেতন মহলের দাবি—হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে দ্রুত কার্যকর করা হোক।
দ্রুত বিচার, ধীর আপিল
ঘটনার মাত্র ৩৩ মাসের মাথায় ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি জেলা ও দায়রা জজ আদালত রায় ঘোষণা করে। ৩৫ আসামির মধ্যে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে ২০১৮ সালের ২২ আগস্ট হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং অন্যদের সাজা বহাল বা সংশোধন করেন।
তবে এরপর প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও আপিল বিভাগে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এই দীর্ঘ বিলম্বে ক্ষোভ, হতাশা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে নিহতদের স্বজনদের।
অপহরণ থেকে লাশ উদ্ধার
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালত থেকে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকা থেকে অপহরণ করা হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দরের শান্তিরচর এলাকা থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল।
তদন্ত ও স্বীকারোক্তি
ঘটনার পর সরকার, পুলিশ ও র্যাব একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা তদন্তের দায়িত্ব পায় এবং ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন ভারতে পালিয়ে গেলে ২০১৫ সালের ১ জুন কলকাতায় গ্রেফতার হন এবং একই বছরের ১২ নভেম্বর তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হয়।
র্যাব-১১ এর সাবেক তিন কর্মকর্তা—লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানা—মামলায় নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তদন্তে আরও কয়েকজন র্যাব সদস্যের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে।
অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য
নিহতদের পরিবার ও কিছু আইনজীবীর অভিযোগ, প্রভাবশালী আসামিদের কারণে আপিল বিভাগে মামলার অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়েছে। তারা দ্রুত রায় কার্যকর করতে প্রধান বিচারপতি ও সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, “বছরের পর বছর ধরে আমরা অপেক্ষা করছি। বিচার যেন আর বিলম্বিত না হয়।”
অন্যদিকে পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির জানিয়েছেন, মামলাটি এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং দ্রুত নিষ্পত্তির আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তারাও রায় কার্যকরের বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিচারহীনতার শঙ্কা বনাম দৃষ্টান্ত স্থাপনের আশা
এই মামলার রায় কার্যকর হলে তা দেশের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে অপহরণ, গুম ও রাজনৈতিক প্রভাবের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে এটি একটি শক্ত বার্তা দেবে।
তবে দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রত্যাশা একটাই—চূড়ান্ত বিচার
১২ বছর পেরিয়ে গেলেও সাত খুনের এই নৃশংস ঘটনার স্মৃতি এখনো তাজা নারায়ণগঞ্জবাসীর মনে। নিহতদের পরিবার, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের একটাই দাবি—দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
বিচার সম্পন্ন হলে শুধু সাতটি পরিবারই নয়, গোটা দেশের মানুষ ন্যায়বিচারের একটি স্পষ্ট বার্তা পাবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।









Discussion about this post