নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ এলাকায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদী মেঘনা নদী দখলের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রায় তিন দশক ধরে ধাপে ধাপে নদীর বিশাল অংশ, এমনকি শাখা খালগুলো পর্যন্ত দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান—যা সরাসরি পরিবেশ, নৌপথ এবং জনস্বার্থের ওপর গুরুতর আঘাত।
অভিযোগ রয়েছে, এই দখল প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং কিছু অসাধু সরকারি কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদ ছিল। নদীতীরবর্তী বহু পুরনো মালিকানাধীন জমিও জোরপূর্বক দখলের শিকার হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। গণমাধ্যমে একাধিক প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেঘনা নদী কেবল একটি নদী নয়—এটি দেশের অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য অপরিহার্য। সেখানে প্রভাব খাটিয়ে নদী দখল শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, এটি জাতীয় সম্পদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অপরাধ। স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক—নয়তো এই দখলদারিত্ব ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এমন গুরুতর অপরাধ কর্মকান্ডের বিষয়টি তুলে ধরে এবার ”মেঘনার পেটে মেঘনা“ শীর্ষক একটি বিশাল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দৈনিক খবরের কাগজ । যা নিম্নে হুবহু তুলে ধরা হলো :
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীর বিশাল অংশ দখলে নিয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি নদীর শাখা খালগুলোও দখল করে গড়ে তুলেছে একাধিক কারখানা। প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে এই দখল-প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। স্থানীয় এমপিসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নদী তীরবর্তী বাপ-দাদার আমলের জমি দখল করেছে মেঘনা গ্রুপ। বিভিন্ন সময়ে এই দখলের কাজে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে সরকারি কর্মকর্তা, প্রতাপশালী রাজনীতিকসহ স্থানীয় নিজস্ব বাহিনী।
দেশের অন্যতম বড় নদী মেঘনা। নদীটি কেবল জলধারা নয়, দেশের অর্থনীতিতে রয়েছে এর ব্যাপক অবদান। পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় নদীটি যুগ যুগ ধরে ভূমিকা পালন করে আসছে। অথচ এখন নদীর জায়গা দখল করে নিচ্ছে মেঘনা গ্রুপ। দেশের অন্যতম শীর্ষ দখলবাজ মেঘনা গ্রুপের নদী দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অনুসন্ধান করেছে গণমাধ্যম।
সরকারি নকশা ও নথিপত্রে থাকা মেঘনা নদীর অনেকাংশ এখন বাস্তবে স্থলভূমিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। নদী দখল নিয়ে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মেঘনা গ্রুপ নদীর অংশ দখল করে বানিয়েছে স্থলভূমির বিস্তীর্ণ করিডর। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও অঞ্চলসংলগ্ন মেঘনা নদীর প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মেঘনা গ্রুপ দখল-আধিপত্যের ‘রাজত্ব’ কায়েম করেছে। নদী তীরবর্তী অঞ্চল দখল করে একাধিক কারখানা গড়ে তুলেছে এই প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে এসব তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে। তবে ‘অজ্ঞাত’ কারণে বিভিন্ন সময়ে নদী উদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন। এমনকি বাস্তবায়িত হয়নি উচ্চ আদালতের রায়। উপেক্ষিত হয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হুকুম-পরামর্শ। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন সময়ে সরকারের প্রভাবশালী মহলে প্রভাব বিস্তার করে মেঘনা গ্রুপ বছরের পর বছর ধরে উচ্ছেদ অভিযান ঠেকিয়ে রেখেছে ও নিত্যনতুন পন্থায় দখল ‘অভিযান’ চালিয়ে যাচ্ছে।
মেঘনা গ্রুপের অফিশিয়াল (নিজস্ব) তথ্যমতে, সোনারগাঁওয়ে মেঘনা নদীর তীরসংলগ্ন মেঘনা ইকোনমিক জোন গড়ে তুলেছে মেঘনা গ্রুপ। প্রায় ২৪৫ একর জায়গাজুড়ে শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে রয়েছে পেপার, টিস্যু, কেমিক্যাল, ফুড, এলপিজি, তেল, খাদ্য, প্যাকেজিং, সিমেন্ট, গার্মেন্টস ও রাসায়নিক কারখানা। রয়েছে পাওয়ার প্ল্যান্টও।
মেঘনার দখলের শুরু ১৯৮৯ সালে
সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের মেঘনা ঘাট এলাকায় প্রথম কারখানা স্থাপন করে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। ১৯৮৯ সালে ছোট পরিসরে মেঘনা নদীর তীরে মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল কারখানা যাত্রা শুরু করে। পরে বছরের পর বছর ধরে (১৯৯০-২০০৫ পর্যন্ত) নদীর তীরে একের পর এক কারখানা প্রতিষ্ঠা করে মেঘনা গ্রুপ। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত নদীর অংশ (স্থানভেদে) ভরাট করে গড়ে তোলে শিল্প ক্লাস্টার। এরপর ২০১৬ সালে ওই এলাকাকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণার পর বেড়ে যায় নদীর অংশ দখল। গড়ে ওঠে শিল্প ও পাওয়ার প্ল্যান্ট জোন। প্রায় ৩৭ বছরে এ অঞ্চলে তাদের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছাড়িয়েছে পঁচিশ।
অনুসন্ধানের শুরু মেঘনা নদীর নকশা-জরিপ থেকে
দেশে এখন নদ-নদীর ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার দায়িত্ব সরকারি সাতটি দপ্তরের। এর মধ্যে নদী-নালা ও খাল-বিলের নকশা, ভূমি জরিপ রেকর্ড, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটির হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভেসহ বিভিন্ন নথিতে (রেকর্ডকৃত) শনাক্ত হয়েছে মেঘনা গ্রুপের নদী দখলের ভয়াবহ চিত্র।
নদী-ভূমির নকশা: (ভূমি জরিপ রেকর্ড)
নদী-চর-ফ্লাডপ্লেইন করিডর নিয়ে ভূমি রেকর্ড, সরকারি জরিপসহ নথিপত্রে নদী-ভূমির প্রকৃতি স্থলভূমিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মেঘনা নদীর উজানের আষাঢ়িয়ার চর থেকে ইসলামপুরে নদী বাঁক নিয়ে আনন্দ বাজার পর্যন্ত প্রায় ১০-১২ কিমি বিস্তৃত। অপর প্রান্তে দুধঘাটা থেকে (পূর্ব-উত্তর) ঝাউচর পর্যন্ত মধ্যবর্তী নদীর সীমানা প্রায় ৬-৭ কিমি। এই পুরো অঞ্চলে মেঘনা গ্রুপ আধিপত্য বিস্তার করেছে।
এর মধ্যে আষাঢ়িয়ার চর থেকে ইসলামপুর হয়ে ঝাউচর দিয়ে নদী সীমানার দুধঘাটা অংশ পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার নদীর তীর ও নদী-ভূমিতে মেঘনা গ্রুপের স্থাপনা রয়েছে। এ ছাড়া মেঘনা নদীর আনন্দ বাজার এলাকায় ১ কিলোমিটারের বেশি জলাশয়ের ওপরে মেঘনা গ্রুপের এলপিজি কারখানাসহ শিপইয়ার্ড স্থাপন করা হয়েছে। এই অঞ্চলের মধ্যে ঝাউচর, আষাঢ়িয়ার চর (স্থানভেদে) এলাকায় প্রায় ০.৮–১.৫ কিলোমিটার বিস্তৃত জলধারা ছিল। মেঘনা গ্রুপের দখলের ফলে এখন তা নেমে এসেছে ২০০-৫০০ মিটার খণ্ডিত চ্যানেলে। দখলের ফলে ইসলামপুর ও দুধঘাটা অংশে নদীর প্রস্থ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এ ছাড়া আনন্দ বাজার অংশে নদী কমে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০-৮০০ মিটার চ্যানেলে। এ অংশে নদীর ১ কিলোমিটারের নিচে রয়েছে জলাশয় ও চর। জমি ভরাটের কারণে এখানে প্রাকৃতিক প্রস্থ কমে সংকুচিত হয়ে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরিপ ও বিআইডব্লিউটির হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে অনুসারে, মেঘনা নদীর ইসলামপুর থেকে আনন্দ বাজার পর্যন্ত দেখানো হয়েছে বিস্তীর্ণ করিডর—যে করিডরের ভেতরে রয়েছে চর রমজান, আষাঢ়িয়ার চর, পিরোজপুর, ছয়হিস্যা ও দুধঘাটা মৌজা। গত তিন দশকে এই অঞ্চলে নদীর কার্যকর জলধারার অংশ ৩০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হয়ে গেছে।
১৯৮৯ সালে ইসলামপুর (চর রমজান) অংশে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ১.২-১.৫ কিমি। ২০২৬ সালে এটি কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩০০-৫০০ মিটারে। চর রমজান (ঝাউচর) এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় এক কিলোমিটার। ২০২৬ সালে এই প্রস্থ নেমে আসে ২৫০-৪০০ মিটারে। আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল ১.২ থেকে ১.৩ কিলোমিটার পর্যন্ত। ২০২৬ সালে এই প্রস্থ নেমে দাঁড়ায় ৪০০ থেকে ৬০০ মিটারের মধ্যে। দুধঘাটা এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল ০.৯-১.১ কিলোমিটারের মধ্যে। ২০২৬ সালে সেই প্রস্থ নেমে দাঁড়ায় ২০০-৪০০ মিটারে। এ ছাড়া পিরোজপুরে ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ১.১ কিলোমিটার। ২০২৬ সালে সেই প্রস্থ কমে দাঁড়ায় ৩০০ থেকে ৫০০ মিটারে। ছয়হিস্যা এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ১ কিলোমিটার। ২০২৬ সালে সেই প্রস্থ কমে দাঁড়ায় ২৫০-৪৫০ মিটারে।
১৯৮৯ সালে আনন্দ বাজার অংশে থাকা নদী করিডরের জলাধার ও চর ছিল ২ থেকে ৪ কিলোমিটার চওড়া। প্রবাহের স্থান ছিল ১ থেকে ১.৫ কিলোমিটারের মতো। ২০২৬ সালে তা কমে প্রায় ১.৫-২.৫ কিমিতে দাঁড়িয়েছে। খোলা পানির প্রবাহ কমে নদীর প্রাকৃতিক বিস্তার ছোট হয়ে গিয়েছে। মূল চ্যানেল এখন ১ কিলোমিটারের নিচে চলে এসেছে।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেঘনা নদীর আষাঢ়িয়ার চর, চর রমজান, পিরোজপুর, ছয়হিস্যা ও দুধঘাটা মৌজা এলাকায় (১৯৮৯-২০২৬) নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে স্থায়ী ভূমি ও অবকাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। এর আগে ১৯৮৮ সালের মেঘনা নদী ছিল অনেক প্রশস্ত। নদীর বুকজুড়ে ছিল চর, আর তীরবর্তী এলাকায় বসতি ছিল সীমিত।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সরকারি নকশা-রেকর্ড-নথিপত্র-স্যাটেলাইট চিত্র ইত্যাদি যাচাই-বাছাই করে প্রমাণিত হয়, উপজেলার বিভিন্ন মৌজার অধীনে চর বলাকি থেকে মেঘনা ঘাট হয়ে উজানের আনন্দ বাজার পর্যন্ত নদী ও তীরবর্তী অঞ্চল দখল করেছে মেঘনা গ্রুপ।
নদীর পাড়ে মেঘনা গ্রুপ জেটি/বার্জ লোডিং ডক, সারি সারি বড় স্টোরেজ ট্যাংক ও পাওয়ার প্ল্যান্ট ব্লক, ফ্রেশ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানাসহ বেশ কয়েকটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছে। এগুলোর সীমানা সরাসরি নদীর ভেতরে বলে প্রমাণিত হয়েছে। আনন্দ বাজারে নদীর অংশ ভরাট করে মেঘনা গ্রুপ নির্মাণ করেছে এলপিজি ইউনিট।
মেঘনার ঝাউচর-প্রতাবের চর অংশে নদীর প্রবেশমুখে ভরাট করে এখনো স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। মেঘনা গ্রুপ নদীর এই অংশ থেকে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে দেয়াল দিয়েছে। এখানে টিস্যু-প্যাকেজিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারখানা নির্মাণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
পশ্চিম প্রান্তে শাখা নদীর (চর বলাকি-আষাঢ়িয়ার চরের পূর্ব প্রান্ত) মেঘনা গ্রুপ ফ্রেশ সিরামিক স্থাপন করেছে। এভাবে দখল করে কারখানা স্থাপন করায় নদী এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে নিয়মিত নৌযান চলাচল। নদীর দুই পাশেই এখন মেঘনা গ্রুপের স্থাপনা রয়েছে। আষাঢ়িয়ার চরের দক্ষিণ সীমানায় নদীর অংশ ভরাট করে মেঘনা গ্রুপ একাধিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে।
গজারিয়ায় চর ও কান্দারগাঁয়ে মেঘনা গ্রুপ
সোনারগাঁও-গজারিয়া সীমান্তে মেঘনা নদীর অংশ ভরাট করে সরকারি জমি ও চর দখল শুরু করেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ফলে সেখানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নৌ চলাচল ও পরিবেশ, উভয়ই হুমকির মুখে পড়ছে। সরকারি নথিপত্র অনুসারে, এ অঞ্চলে নতুন করে নদীর তীরবর্তী কয়েক শ একর জমি কিনেছে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অন্যতম।
এ ছাড়া নদীর পাড়ে কান্দারগাঁয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে বালু ভরাট করেছে মেঘনা গ্রুপ। এর বিস্তৃতি ছড়িয়েছে নদী পর্যন্ত। মেঘনা ঘাটের ইসলামপুর থেকে আনন্দ বাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ করিডরে দীর্ঘদিন বালু ভরাট, চর দখল ও স্থায়ী নির্মাণ কার্যক্রম নদীর স্বাভাবিক গতিপথকে বদলে দিয়েছে। ২০২০ সালে নদী ও চর এলাকার বড় অংশ স্থায়ী ভূমিতে রূপান্তরিত হওয়ায় এখন নদীর প্রাকৃতিক চ্যানেল পুরোপুরি সংকুচিত। মেঘনা নদীর আষাঢ়িয়ার চর থেকে ঝাউচর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ নদী-ভূমিতে মেঘনা গ্রুপের পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক দখল-ভরাটে এলাকাটি পূর্বের চেহারা হারিয়ে প্রায় অচেনা রূপ নিয়েছে।
মেঘনা গ্রুপের নদী দখল-আধিপত্য
মেঘনা নদী দখল হতে দেখেছেন নদী তীরবর্তী এমন ৪৩ জন স্থানীয় নারী-পুরুষ বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছে খবরের কাগজ। তাদের অধিকাংশই একই তথ্য ও বিবরণ (মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল মেঘনা গ্রুপ দখল করেছে) দিয়েছেন। এর মধ্যে দুজনের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
দুধঘাটা গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আবদুল লতিফ খবরের কাগজকে বলেন, মেঘনা গ্রুপ যখন এখানে আসেনি, তখন নদীটি ছিল বিশাল প্রমত্তা নদী। নদীর পাড়ে ছিল চর, স্থানীয় লোকজনের জমিও ছিল সেখানে। গত ১৬ বছরে উপজেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল) সহসভাপতি ও পিরোজপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম মেঘনা গ্রুপের হয়ে নদী ভরাটে যুক্ত হন। মাসুমের আগে মেঘনা গ্রুপের হয়ে নদী ভরাটের কাজ করেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম (বিডিআর)। মাসুম ও রফিক শুধু নদী ভরাটই করেননি, চরগুলোও দখল করে মেঘনা গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয়দের জমিও তারা মেঘনা গ্রুপের হয়ে জোর করে দখল করেছেন। স্থানীয়দের জমি দখলে এই নেতারা দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা গ্রুপের বিশ্বস্ত অনুচর হিসেবে কাজ করেছেন।
৩০ বছর আগের নদীর সীমানা দেখিয়ে আষাঢ়িয়ার চরের স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ‘ফ্রেশ কোম্পানি (মেঘনা গ্রুপ) প্রথমে নদীর সীমানা ঘেঁষে জমি কেনে। তারপর নদীর অংশ দখল করা শুরু করে।’
তিনি বলেন, ‘মেঘনার শাখা নদীটি দুধঘাটা হয়ে আষাঢ়িয়ার চর হয়ে দুভাবে ঝাউচরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এই শাখা নদীর দুই পাশই এখন মেঘনা গ্রুপের দখলে। এ কারণে শাখা নদীটি সরু হয়ে গেছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদুর রহমান মাসুমের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি পলাতক। তবে উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি নদী নয়, চর ভরাট করেছেন।
এমপির ৩০ বিঘা জমিও মেঘনা গ্রুপের দখলে
স্থানীয় সংসদ সদস্য (নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন) আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, ‘মেঘনা গ্রুপ আমার জমি দখল করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মেঘনা গ্রুপ আমার জায়গা দখল করে নিছে। আমার ৩০ বিঘা জমি এখনো মেঘনা গ্রুপের দখলে আছে।’
নদী দখলে মেঘনা গ্রুপ ক্ষমতাধর উল্লেখ করে মান্নান বলেন, আসলে স্থানীয়ভাবে বড় কোম্পানির সঙ্গে পারা যায় না। কিন্তু এই সরকার পারবে, কারণ তারা জনগণের সরকার। মেঘনা নদীর দখল নিয়ে সরকারের সকল পর্যায়ে ও জাতীয় সংসদে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।
নদী থেকে খাল, সবখানে দখল মেঘনা গ্রুপের
মেঘনা গ্রুপের দখলের হাত থেকে রক্ষা পায়নি এর শাখা খালগুলোও। মেঘনা নদী থেকে সৃষ্ট তিনটি খালই এখন মেঘনা গ্রুপের দখলে। খালের অংশ দখল করে কারখানা গড়ে তুলেছে মেঘনা গ্রুপ। যেটুকু বাকি আছে, সেটুকুও দখল হয়ে আছে মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে।
৩ খালে কারখানা
সরকারি নদী-নালা ও খাল-বিলের নকশা এবং ভূমি জরিপ রেকর্ড অনুসারে, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের বসুন্দরদি নকশায় পাওয়া গেছে হরিগঞ্জ খাল। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই খালের প্রস্থ ছিল ২৫-৩০ ফুট। দখলের ফলে খালটির অনেক জায়গাই এখন ৫ থেকে ৮ ফুটের সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে। একই ইউনিয়নের নরসুলদি নকশায় রয়েছে রামদির খাল। নকশায় খালের প্রস্থ প্রায় ২০-৩০ ফুট। এখন এটিও সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে হরিগঞ্জ খালের অংশে মেঘনা গ্রুপের এলপিজি কারখানা ও রামদির খালের সীমানায় নির্মাণ করা হয়েছে মেঘনা শিপইয়ার্ড।
অপর প্রান্তে রয়েছে মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কুশাসন মৌজায় অবস্থিত ঝিউরতলা খাল। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে প্রায় ২০-৪০ ফুট চওড়া ছিল ঝিউরতলা খাল। দখলের কারণে এখন এটি একটি সরু খালে রূপ নিয়েছে। এই ঝিউরতলা খালের অংশেই গড়ে তোলা হয়েছে মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন।
ভোগান্তিতে খালপাড়ের বাসিন্দারা
হরিগঞ্জ খালের মুখ পুরোপুরি দখল করা হয়েছে বলে জানালেন আনন্দ বাজার এলাকার বাসিন্দা মহিবুল্লাহ প্রধান। তিনি বলেন, ‘হরিগঞ্জ খালের মাথায় মেঘনা নদীর সীমানা। ওই অংশটি দখলে নিয়ে মেঘনা গ্রুপ তাদের এলপিজি কারখানা নির্মাণ করেছে। এ অংশে তারা নদীর সীমানাও দখল করেছে। খাল দখলের বিরুদ্ধে গ্রামবাসী প্রতিবাদ করেছে। তবে মেঘনা গ্রুপ স্থানীয় নেতা ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের লোকজন দিয়ে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে মামলাসহ নানা হয়রানি করেছে।’
রামদি খালের অংশবিশেষ দখলে নিয়েছে মেঘনা গ্রুপ। এ বিষয়ে মামরতপুর গ্রামের বাসিন্দা সানাউল্লাহ ব্যাপারী বলেন, ‘খালের সঙ্গে যেখানে নদীর সীমানা মিলেছে, সেখানেই মেঘনা গ্রুপ শিপইয়ার্ড বানিয়েছে।’
কামারগাঁও হয়ে ঝিউরতলা পর্যন্ত বয়ে যাওয়া খালও মেঘনা গ্রুপের দখলে বলে জানান এই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এখানে মেঘনা গ্রুপ ইকোনমিক জোন বানানোর সময় ঝিউরতলা খালের অংশবিশেষ দখল করে নিয়েছে। খালের তিন ভাগের বেশির ভাগই তাদের দখলে। তারা এখানে দেয়াল তুলে খাল দখল করে রেখেছে। আর এই খালের বাকি অংশ দিয়ে তারা কারখানার বর্জ্য ফেলে।’
মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল প্রেস কাউন্সিলে একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা এক মামলায় জানিয়েছেন, আষাঢ়িয়ার চর মৌজায় তার প্রকল্প এলাকার দৈর্ঘ্য ১.১৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ০.২১ কিলোমিটার। তিনি সেখানে আরও জানান, আষাঢ়িয়ার চর মৌজায় কোম্পানির কেনা জমির পরিমাণ ২১০ বিঘা এবং সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্তপ্রাপ্ত জমি ৭.৩৩ বিঘা। অর্থাৎ এই মৌজায় মোট জমির পরিমাণ ২১৭.৩৩ বিঘা। অথচ নামজারিতে মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের নামে রয়েছে ৪৮.০২ বিঘা জমি। এটি মাত্র একটি মৌজার হিসাব। অন্যগুলোতেও অনুরূপ চিত্র পাওয়া যায়।
গুগল আর্থ: চিত্র বিশ্লেষণ
বিভিন্ন সময়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মেঘনা নদীর আষাঢ়িয়ার চর, চর রমজান, পিরোজপুর, ছয়হিস্যা, দুধঘাটা ও নরসুলদী মৌজা এলাকায় (১৯৮৯-২০২৬) নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে স্থায়ী ভূমি ও অবকাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। মেঘনা গ্রুপ নদীর ১২ কিলোমিটারের বেশি এলাকা ভরাট করে কারখানা স্থাপন করেছে। এর আগে ১৯৮৮ সালের মেঘনা নদী ছিল অনেক প্রশস্ত। নদীর বুকে ছিল একচিলতে চর। মেঘনা গ্রুপ সেখানে এসে ধীরে ধীরে চারদিক দখল ও ভরাট করে কারখানা প্রতিষ্ঠা করে।
ভূমি কর্মকর্তার বক্তব্য
হোসেনপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) হাবিবুর রহমান মুন্সী বলেন, আষাঢ়িয়ার চর ও চর রমজান মৌজায় মেঘনা গ্রুপ নামজারি করা সম্পত্তির খাজনা (রাজস্ব) প্রদান করে আসছে। কিন্তু এখানে ‘ক’ তফসিলভুক্ত (সরকারি সম্পত্তির অংশ) বন্দোবস্ত নেওয়ায় সেগুলোর রাজস্ব তারা দেয় না। এর বাইরে নদীর দখলি অংশের কোনো রাজস্ব আসেনি।
মোগরাপাড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার জানান, মেঘনা গ্রুপ শুধু নামজারি করা জমির রাজস্ব প্রদান করে। মেঘনা ইকোনমিক জোনের রাজস্ব মওকুফ করা আছে। এ ছাড়া কামারগাঁও, কুশাসন মৌজায় খালের অংশ মেঘনা গ্রুপের দখলে। এখান থেকে কোনো রাজস্ব আসে না।
প্রতিবাদ করায় পরিবেশকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হয়রানি
মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে নদী-খাল দখল ও দূষণ নিয়ে বহুবার প্রতিবাদ জানিয়েছে স্থানীয় পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে অভিযোগপত্র পাঠান তারা। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হোসাইন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ‘মেঘনা গ্রুপ মেঘনা নদীর অংশবিশেষ অবৈধভাবে দখল করে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।’
হোসাইন খবরের কাগজে বলেন, ‘মেঘনা গ্রুপের দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করায় আমিসহ অনেকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে। তাদের অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিবেদন করলেই মামলা করা হয়। এ কারণে কেউ সংবাদ প্রকাশ করে না।’
নদী রক্ষায় বর্তমান সরকারের কাছে মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম।
তিনি বলেন, ‘নদী-নালা ও খাল-বিল রক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা মেঘনা গ্রুপের কাছ থেকে সুবিধা ও টাকা নিয়ে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সহযোগিতা করছেন। আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল) আমলে নদীকে ধ্বংস করে মেঘনা গ্রুপ। এবার তাই শীর্ষ দখলবাজ মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে জনগণের সরকারের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নয়তো একসময় মেঘনা গ্রুপ আর মেঘনা নদীই রাখবে না।’
নদী রক্ষা কমিশনের তদন্ত
২০১৯ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ কয়েকটি দপ্তর নিয়ে গঠিত হয় ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি। কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনারগাঁও এলাকায় অন্তত ৩০০ থেকে ১৬০০ বিঘা পর্যন্ত মেঘনা নদীর জমি বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী দখল করেছে। এর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ হচ্ছে শীর্ষ দখলবাজ। পরে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের উদ্যোগে ২০১৯-২০২১ সাল পর্যন্ত দুই বছর তদন্ত চালানো হয়। তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনারগাঁও এলাকায় মেঘনা নদী ও প্লাবনভূমি অবৈধভাবে দখল ও ভরাট করেছে মেঘনা গ্রুপ। তাদের অন্তত ৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরাসরি নদীর অংশে নির্মিত। কমিশনের তদন্তে নদী দখলকারী মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও উচ্ছেদ অভিযান চালাতে বলা হয় স্থানীয় প্রশাসনকে।
মেঘনা নদী দখল-ভরাটে মামলা
২০১৪ সালে সোনারগাঁওয়ের মেঘনা নদী ও আশপাশের জলাভূমি ভরাট ও দখলের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) পক্ষে রিট মামলা করেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারে তিনি উপদেষ্টা ছিলেন। ওই মামলায় ২০১৮ সালে হাইকোর্ট নতুন ভরাট, দখল বা নির্মাণ বন্ধ করার আদেশ দেন।
২০২০ সালে হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ে সোনারগাঁওয়ের ৬টি মৌজায় প্রায় ১৮৬৮ বিঘা জমি ও মেঘনা নদীর অংশ ভরাটকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ভরাট করা জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সোনারগাঁওয়ের ৬টি মৌজায়—মেঘনা নদীর অংশ, কৃষিজমি, নিম্নভূমি ও জলাভূমিতে মাটি ভরাটের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা দেন। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় বহাল রাখাসহ নতুন করে ভরাট বন্ধ রাখতে বলে। স্থানীয় প্রশাসনকে এই আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হলেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।
বাস্তবায়ন হয়নি উচ্চ আদালতে নির্দেশ, উদ্ধার হয়নি নদী
বারবার হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও নতুন করে ভরাট ও দখল চালিয়ে যাচ্ছে মেঘনা গ্রুপ। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনের নির্দেশ মেনে কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালায়নি জেলা-উপজেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পরিবেশ অধিদপ্তর। কেউই প্রয়োগ কিংবা বাস্তবায়ন করেনি নদী রক্ষা আইন; বরং মেঘনা গ্রুপের দখলীয় নথিপত্র গোপন করতে দপ্তরের কর্মকর্তারা যোগাযোগ রাখেন মেঘনা গ্রুপের সঙ্গে।
৩৬ বছরে দুবার, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা
নদী ও খাল দখল নিয়ে মেঘনা গ্রুপ উচ্চ চাপে পড়ে এ পর্যন্ত মাত্র দুবার জরিমানা ও উচ্ছেদের মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৯ সালে বিআইডব্লিউটিএ মেঘনা নদী দখলে রাখা মেঘনা গ্রুপের প্রায় ৩৫টি স্থাপনা উচ্ছেদ করে ও কাঠামো ভেঙে দেয়। এর আগে ২০১২ সালে আনন্দ বাজার এলাকায় (গ্রুপের এলপিজি ইউনিট) প্রায় ৩০ একর নদীতীর ও জলাভূমি ভরাট করার অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তর মেঘনা গ্রুপকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করে। একই সঙ্গে ভরাট করা অংশ নদীরূপে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়, যা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।
এবার নদী রক্ষক ও স্থানীয় প্রশাসন কী করবে
সোনারগাঁওয়ে নদী ও খাল দখল নিয়ে বহুবার জেলা, উপজেলা প্রশাসনসহ সরকারি সংস্থাগুলো তালিকা প্রস্তুত করেছে। তবে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি কখনো। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তদন্তের পর ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও তা করতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন।
দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা নদীর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটির মেঘনা নদীবন্দরের উপপরিচালক রেজাউল করিমের কাছে মেঘনা গ্রুপের নদী দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নদী দখল বন্ধে তদারকি চলমান আছে। এখানে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিষয় নয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্দেশ দিলে সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে।
সরকারের নির্দেশে দখল হওয়া নদী ও খালগুলো উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহাম্মেদ। পাউবোর সীমানায় কেউ স্থাপনা নির্মাণ করে থাকলে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বলে দৃঢ়তার সঙ্গে জানান তিনি।
নদী-খাল দূষণ করায় মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক এ এইচ এম রাসেদ। তিনি বলেন, মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে দূষণের অভিযোগ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তাদের দূষণের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে।
নদী ও পরিবেশ রক্ষায় এবার প্রশাসন সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসিফ আল জিনাত। তিনি বলেন, এখানকার নদী ও খালগুলো সংরক্ষণ করতেই হবে। তাই মেঘনা নদী ও খাল দখলের বিষয়ে যদি কোনো অভিযোগ বা প্রতিবেদন পাই, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে উপজেলা প্রশাসন। সরকারি নকশা-নথিপত্রে তথ্যে মিল পেলে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আইনানুগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মেঘনা গ্রুপের নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না–জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, ‘আগের কোনো জেলা প্রশাসক এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না, তা আমার জানা নেই। তারা যদি এখনো নদী-জমি দখলে রাখে, তাহলে জেলা প্রশাসন বিষয়টি দেখবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
মেঘনা গ্রুপের কর্মকর্তাদের দাবি
নদী দখলের অভিযোগ ও সরকারি নোটিশের বিষয়ে জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপের আইন বিভাগের কর্মকর্তা (ম্যানেজার লিগ্যাল) আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জানামতে নদী দখলের বিষয়ে মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিশ বা যদি কোনো উচ্ছেদ অভিযান হতো, তবে সেটি সংবাদমাধ্যমের অগোচরে থাকার কথা নয়।’ নদী বা জায়গা দখলের বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার তার নেই জানিয়ে আশফাকুল ইসলাম ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বা মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক (টেকনিক্যাল) কার্তিক চন্দ্র দাস এ অঞ্চলের দায়িত্বে আছেন। কার্তিক চন্দ্র দাসের সঙ্গে মুঠোফোনে বহুবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। খুদে বার্তা দিয়েও উত্তর পাওয়া যায়নি। মেঘনা ইকোনমিক জোনে অবস্থিত তার অফিসে গেলেও সেখানে এই প্রতিবেদককে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
মেঘনা গ্রুপের দখলদারত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (এডমিন) তৌফিক উদ্দিন আহমেদ গতকাল শনিবার বলেন, ‘আমি সাবেক একজন জেলা প্রশাসক। গত তিন বছর যাবৎ মেঘনা গ্রুপে দায়িত্ব পালন (চাকরি) করছি। এসব বিষয় আমি দেখি না, আমি গ্রুপের গাড়ি বা এ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখি। এর বাইরে কোনো খবর আমি রাখি না। অন্য কারও বক্তব্য নিতে পারেন।’









Discussion about this post