১৭ মাস পর ডাকাত সর্দার শনাক্ত—স্বর্ণ ফেরত তো দূরের কথা, উল্টো ৪০ মিনিট আটকে হেনস্থা গৃহবধূ
নগর প্রতিনিধি :
ফতুল্লায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ডাকাতির ঘটনায় ১৭ মাস পর নতুন করে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক বাস্তবতা—ডাকাত সর্দারকে শনাক্ত করতে গিয়ে ভুক্তভোগীই পুলিশের হাতে হেনস্তার শিকার হয়েছেন।
ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা, পেশাদারিত্ব এবং ভুক্তভোগী সুরক্ষার বিষয়টি আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ডাকাত শনাক্ত, কিন্তু আচরণে উল্টো পুলিশ !
বৃহস্পতিবার দুপুরে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে গৃহবধূ বেবী আক্তার জানতে পারেন, তার বাড়িতে ডাকাতির ঘটনায় অভিযুক্ত ডাকাত সর্দার আব্দুল হালিম ফতুল্লা থানায় রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে স্বামী আলাউদ্দিনকে নিয়ে থানায় গিয়ে পুলিশের সামনেই তিনি হালিমকে শনাক্ত করেন।
এসময় ক্ষোভে একটি চড় দিয়ে নিজের লুট হওয়া স্বর্ণালংকার ফেরতের দাবি জানান বেবী আক্তার। কিন্তু এখানেই ঘটে চরম অস্বাভাবিকতা—ডাকাতকে ঘিরে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে পুলিশের এক এসআই ভুক্তভোগীর উপরই চড়াও হন।
অভিযোগ রয়েছে, এসআই নন্দন চন্দ্র সরকার গৃহবধূর সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন এবং পরে নারী পুলিশ ডেকে এনে তাকে টেনে-হিঁচড়ে ডিউটি অফিসারের কক্ষে নিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট আটকে রাখা হয়।
ডাকাতির বর্ণনা : ভয়াবহ নির্যাতনের স্মৃতি
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন জানান, ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর রাতে ফতুল্লার সস্তাপুর এলাকায় নিজ বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে ও তার স্ত্রীকে হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে মারধর করে ডাকাত সর্দার আব্দুল হালিম ও তার সহযোগীরা। এরপর প্রায় ৫০ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ৭ লাখ টাকা লুট করে নেয় তারা।
ঘটনার পর মামলা দায়ের করা হলেও তদন্ত ও উদ্ধার কার্যক্রমে পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ তোলেন তিনি। তার দাবি, র্যাব হালিমকে গ্রেফতার করে থানায় সোপর্দ করলেও পুলিশ কখনোই তাদের সামনে এনে শনাক্ত করার সুযোগ দেয়নি।
‘উদ্ধার’ স্বর্ণ দেখাতেও অনীহা !
আরও উদ্বেগজনক অভিযোগ—ডাকাতদের কাছ থেকে কিছু স্বর্ণালংকার উদ্ধারের দাবি থাকলেও ভুক্তভোগীদের তা দেখানো হয়নি। বেবী আক্তার বলেন, একটি স্বর্ণের চেইন নিজের বলে সন্দেহ হওয়ায় সেটি দেখতে চাইলে পুলিশ তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানায়।
টাকা নিয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেই ?
বেবী আক্তারের অভিযোগ, ডাকাতদের ধরতে গাড়ি ভাড়া ও খাবারের খরচের অজুহাতে একাধিকবার তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে পুলিশ। অথচ সেই খরচের বিনিময়ে কার্যকর কোনো অগ্রগতি বা সম্পদ উদ্ধারের নিশ্চয়তা তারা পাননি।
পুলিশের অবস্থান: দায় এড়ানোর চেষ্টা ?
এ বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মাহবুব আলম বলেন, “পুলিশের সামনে কোনো আসামিকে চড় মারা অবশ্যই অন্যায়।” তবে ডাকাতির সময় তিনি ওই থানার দায়িত্বে ছিলেন না বলে উল্লেখ করেন—যা অনেকের কাছে দায় এড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবেই প্রতীয়মান।
প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দেবে ?
এই ঘটনার পর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে—
# কেন গ্রেফতারকৃত ডাকাতকে ভুক্তভোগীর সামনে শনাক্তের জন্য আনা হয়নি?
# উদ্ধার করা স্বর্ণালংকার ভুক্তভোগীদের দেখানো হলো না কেন?
# থানার ভেতরে একজন গৃহবধূকে ৪০ মিনিট আটকে রাখার বৈধতা কোথায়?
# পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের তদন্ত হবে কি?
উপসংহার : ন্যায়বিচার নয়, ভয় ও অবিশ্বাসের বার্তা
একটি রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু ফতুল্লার এই ঘটনা উল্টো বার্তা দিচ্ছে—যেখানে ডাকাতের চেয়ে পুলিশের আচরণই বেশি আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহিতা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নতুবা এমন ঘটনায় সাধারণ মানুষের আস্থা আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকবে—যা কোনোভাবেই একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের জন্য কাম্য হতে পারে না।








Discussion about this post