আদালত প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার জামতলায় বিকাশ ব্যবসায়ী মো. মোতালেব হোসেন (৬১)-কে নির্মমভাবে হত্যা করে অর্থ লুটের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে পুলিশ।
এই ঘটনায় মূলহোতা জাকিরসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করলো—অর্থের লোভ মানুষকে কতটা নিষ্ঠুর ও পাষাণে পরিণত করতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, শুধুমাত্র বিকাশ অ্যাকাউন্টের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
হত্যার আগে ঠাণ্ডা মাথায় ফাঁদ পেতে মোতালেব হোসেনকে বাসায় ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়, এরপর তার অ্যাকাউন্ট থেকে ৮৬ হাজার টাকা ক্যাশ আউট করে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়—যা নিছক খুন নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত নৃশংসতা।
গ্রেফতারকৃত প্রধান আসামি জাকির (৫০) আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে পুরো ঘটনার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের ইন্সপেক্টর আব্দুস সামাদ জানান, আজ শুক্রবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ আদালতের বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নূর মহসিন এর আদালতে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দে প্রদান করেন হত্যা মামলার গ্রেফতারকৃত আসামি জাকির। এ মামলার ওপর দুই আসামিকে দুইদিন করে বিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
অথচ এই স্বীকারোক্তি কোনো অনুশোচনার গল্প নয়, বরং লোভ ও অপরাধপ্রবণতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
একই মামলায় অপর দুই আসামি ওমর ফারুক (২২) ও সোহেল (৪৯)-কে দুইদিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
পুলিশের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে বন্দর থানার সেলসারদী এলাকা থেকে জাকিরকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ফতুল্লার মাসদাইর এলাকার একটি সড়কের পাশ থেকে লেপ-তোশকে মোড়ানো অবস্থায় মোতালেব হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়—যা পুরো এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, সিসিটিভি ফুটেজে জাকিরকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে মোতালেব হোসেনকে নিজের বাসার দিকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। এই দৃশ্যই প্রমাণ করে, হত্যার আগে পুরো পরিকল্পনাটি ছিল অত্যন্ত হিসাবি ও পূর্বপরিকল্পিত। পরে তার বাসা থেকে নিহতের ব্যবহৃত টিফিন বক্স উদ্ধার করা হয়—যা অপরাধের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত।
পুলিশ আরও জানায়, জাকির ঘটনার দিন সকাল থেকেই ওত পেতে ছিল। সুযোগ বুঝে সে মোতালেবকে বাসায় নিয়ে যায়, টাকা লুট করে হত্যা করে এবং গভীর রাতে মরদেহ লেপ-তোশকে পেঁচিয়ে অটোরিকশায় করে ফেলে রেখে যায়। এই বর্বরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সমাজে ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতার ভয়াবহ উদাহরণ।
এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে সুমনা আক্তার মিম বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে—শুধু গ্রেফতারেই কি শেষ হবে বিচার, নাকি এই নৃশংসতার পেছনের পুরো চক্র উন্মোচিত হবে ?
ফতুল্লা মডেল থানার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও সিসিটিভি বিশ্লেষণের মাধ্যমে আসামিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। হত্যায় ব্যবহৃত অটোরিকশা, লুট করা টাকা, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো পলাতক আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করলো—আইনের শাসন দুর্বল হলে এবং অপরাধীদের মধ্যে ভয় না থাকলে সাধারণ মানুষই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া এ ধরনের নির্মম অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়।









Discussion about this post