নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় একটি প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারী কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিটের প্রায় চার ঘণ্টার টানা প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও, ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাত পৌনে ২টার দিকে সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়নের মসিনাবন্দ বাড়িরটেক এলাকায় অবস্থিত ‘প্লাস্টিক সাইন প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের একটি কারখানায় আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যেই পুরো কারখানা ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান শিখায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের মণ্ডলপাড়া স্টেশনের তিনটি, হাজীগঞ্জ স্টেশনের দুটি এবং ফতুল্লা স্টেশনের দুটি ইউনিটসহ মোট সাতটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। দীর্ঘ চার ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর ভোর আনুমানিক ৬টার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন জানান, অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, যা স্বস্তির বিষয়। তবে কারখানার ভেতরে বিপুল পরিমাণ দাহ্য প্লাস্টিক কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য থাকায় আগুন দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কারখানাটিতে পলিব্যাগ, হ্যাঙ্গার, স্কচটেপসহ বিভিন্ন প্লাস্টিকজাত পণ্য উৎপাদন করা হতো। প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা
এ ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—কারখানাটিতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল? নিয়মিত ফায়ার ড্রিল, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবহার, বৈদ্যুতিক লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা আদৌ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে অতীতে ঘটে যাওয়া একাধিক অগ্নিকাণ্ডের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
দুর্ঘটনা না কি নাশকতা—তদন্তেই মিলবে উত্তর
ঘটনার পরপরই স্থানীয় পর্যায়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—এই অগ্নিকাণ্ড নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো নাশকতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কাজ করেছে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, শিল্প এলাকায় এমন বড় অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে সব সম্ভাবনাই গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে ফরেনসিক তদন্ত, বৈদ্যুতিক সিস্টেমের পরীক্ষা এবং কারখানার ব্যবস্থাপনা কাঠামোর স্বচ্ছ মূল্যায়ন জরুরি। তাতে শুধু এই ঘটনার রহস্যই উদ্ঘাটিত হবে না, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
উপসংহার
নারায়ণগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় সংঘটিত এই অগ্নিকাণ্ড আবারও শিল্প এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও বিপুল আর্থিক ক্ষতি ও আতঙ্ক শিল্প খাতের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ প্রকাশ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শিল্পকারখানাগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।








Discussion about this post