নগর প্রতিনিধি :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়ছে। পাঁচটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ–৪ (ফতুল্লা–সিদ্ধিরগঞ্জ আংশিক) আসন। এই আসনকে ঘিরে চলছে ব্যাপক সমালোচনা, গুঞ্জন ও বিতর্ক—যার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন এক বিতর্কিত চরিত্র, মোহাম্মদ আলী; যিনি স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘নয় লাইখ্যা ব্যাংক ডাকাত’ নামে।
স্থানীয়দের একাংশের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বললেও বাস্তবে এই নির্বাচনী মাঠে এমন সব প্রার্থী হাজির হচ্ছেন, যাদের অতীত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় অজানা। মোহাম্মদ আলী তাদের অন্যতম।
‘নয় লাইখ্যা ব্যাংক ডাকাত’ তকমার ইতিহাস
ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকায় এখনো আলোচিত একটি নাম—মোহাম্মদ আলী। স্বাধীনতার পর আদমজী মিলের প্রায় নয় লাখ টাকা লুটের ঘটনায় ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগে তার নাম ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। সেই ঘটনার পর থেকেই স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘নয় লাইখ্যা ব্যাংক ডাকাত মোহাম্মদ আলী’ নামে।
সমালোচকদের দাবি, তিনি ছিলেন একটি ডাকাত দলের সরদার।
যদিও এই প্রজন্মের অনেকেই সেই ইতিহাস জানেন না, তবে পুরোনো বাসিন্দাদের কাছে বিষয়টি এখনো ‘খোলা গোপন রহস্য’।
কিং মেকার নাকি কিং জোকার ?
নির্বাচনের মাঠে নিজেকে ‘কিং মেকার’ হিসেবে উপস্থাপন করতে গিয়ে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন মোহাম্মদ আলী। ফতুল্লার অনেক বাসিন্দার ভাষ্য, তিনি কিং মেকার নন, বরং ‘কিং জোকার’। কারণ, একের পর এক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্যতা এবং সুযোগসন্ধানী ভূমিকা তার রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রতীক বদল, অবস্থান বদল
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগেই নারায়ণগঞ্জজুড়ে ধানের শীষের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারে ছেয়ে ফেলেন মোহাম্মদ আলী। তবে বিএনপি তাকে প্রার্থী হিসেবে মূল্যায়ন না করায় শেষ পর্যন্ত তিনি হাতির প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামেন। এই প্রতীক বদলকেও অনেকেই রাজনৈতিক ভণ্ডামির আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন
সমালোচকদের মতে, স্বাধীনতার আগে ৭০–এর দশকে মোহাম্মদ আলী ছিলেন একজন সাধারণ লেবার। স্বাধীনতার পর নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করলেও তার এই দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে এ নিয়ে এখনো প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক চলমান।
মামলা, পলায়ন ও পুনর্বাসনের অভিযোগ
ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার পর দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এরশাদ আমলে প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করে মামলার জট কাটানোর অভিযোগও ওঠে। পরবর্তী সময়ে কখনো জাতীয় পার্টি, কখনো বিএনপির নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় আসে ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে—যেখানে তিনি হঠাৎ করেই সংসদ সদস্য হয়ে ওঠেন। তখন থেকেই ‘নয় লাইখ্যা ডাকাত সরদার’-এর নামের পাশে যুক্ত হয় ‘সাবেক সংসদ সদস্য’ পরিচয়।
ওসমান পরিবারের ছায়াতলে ১৫ বছর
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মোহাম্মদ আলী ওসমান পরিবারের আশ্রয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অনেকেই তাকে ওসমান পরিবারের ‘খয়ের খা’ হিসেবে আখ্যা দেন। এই সময়কালে তার প্রভাব, সম্পদ ও দাপট বহুগুণে বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগ—সবখানেই উপস্থিতি
নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করলেও জামায়াত নেতা মাওলানা মইন উদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক ও ঘনিষ্ঠতার ছবিও আলোচনায় এসেছে। এবারের নির্বাচনে পলাতক শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে নিয়ে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে পাশে রেখে বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ শহীদুল্লাহর সঙ্গে তার প্রকাশ্য প্রচারণা। অথচ শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে জুলাই যোদ্ধাদের ওপর গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একাধিক মামলার অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারকেন্দ্রিক অপরাধ সাম্রাজ্যের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, মোহাম্মদ আলীর পরিবারের সদস্যরা চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, মাদক ব্যবসা ও তেল চুরিসহ নানা অপকর্মে জড়িত। এসব কার্যক্রম এখনো ‘বীরদর্পে’ চলমান বলেও দাবি করা হয়।
ওসমান পরিবারের এজেন্ডা ?
পঞ্চবটি এলাকার একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, মোহাম্মদ আলী মূলত নির্বাচন করছেন না জনগণের জন্য—তিনি মাঠে নেমেছেন ওসমান পরিবারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। তাদের মতে, ওসমান পরিবারের বৈধ–অবৈধ সম্পদ রক্ষা এবং নিজের অবৈধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখাই এই নাটকীয় নির্বাচনের মূল লক্ষ্য।
প্রশ্ন থেকেই যায়
সব অভিযোগ, বিতর্ক ও গুঞ্জনের ভিড়ে একটি প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে—
নারায়ণগঞ্জ–৪ আসনের ভোটাররা কি আবারও ‘নয় লাইখ্যা কিং জোকার’-এর রাজনৈতিক নাটকের সাক্ষী হতে যাচ্ছেন, নাকি এবার তারা ইতিহাস জানার পর নতুন সিদ্ধান্ত নেবেন ?








Discussion about this post