নিজস্ব প্রতিবেদক | নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত একটি নাম নজরুল ইসলাম আজাদ।
নিজেকে বিএনপির ‘পরিবারের সদস্য’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বহুদিনের।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত ভাষায়—এই পরিচয়কে পুঁজি করেই আজাদ নিজেকে নারায়ণগঞ্জের ‘গডফাদার’ হিসেবে তুলে ধরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, নারায়ণগঞ্জের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় আজাদের নিজস্ব অনুসারী ও বাহিনী ছিল, যাদের তৎপরতা নিয়ে নানা সময় প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আজাদের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে—এগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অপপ্রচার।
বিএনপি টিকিট ও হঠাৎ দৃশ্যপট বদল
সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জ–২ (আড়াইহাজার) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর নজরুল ইসলাম আজাদ নতুন করে আলোচনায় আসেন। দলীয় কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রচারণায় তার সরব উপস্থিতি স্থানীয় রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
তবে দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায় এক নির্বাচনী জনসভায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়—মঞ্চে উপস্থিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নজরুল ইসলাম আজাদকে এক পর্যায়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, মঞ্চে উপস্থিত হাজারো নেতাকর্মীর সামনে এ ঘটনা ঘটে, যা মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়, রাজনৈতিক বার্তা ?
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। অনেকেই একে ‘রাজনৈতিক বার্তা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য মঞ্চে এমন আচরণ দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের অবস্থান স্পষ্ট করার ইঙ্গিত হতে পারে।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “দলীয় প্রধানের উপস্থিতিতে এমন ঘটনা সাধারণত হালকাভাবে ঘটে না। এর পেছনে সাংগঠনিক অসন্তোষ বা অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
‘হিরো থেকে জিরো’—জনমনে সমালোচনার ঝড়
যে নজরুল ইসলাম আজাদ একসময় স্থানীয় রাজনীতিতে দাপুটে নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, সেই তিনিই এখন সমালোচনার কেন্দ্রে। সামাজিক মাধ্যমে তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ, প্রশ্ন ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। কেউ কেউ বলছেন—রাজনৈতিক প্রভাব দেখানোর সংস্কৃতির অবসান ঘটছে, আবার কেউ এটিকে অভ্যন্তরীণ দলীয় দ্বন্দ্বের ফল হিসেবে দেখছেন।
আজাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ঘুরে ফিরে আসে
অনুসন্ধানে উঠে আসে, অতীতেও নজরুল ইসলাম আজাদকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে—
# প্রভাব বিস্তার করে স্থানীয় রাজনীতিতে আধিপত্য বজায় রাখার অভিযোগ
# নিজস্ব অনুসারী বাহিনী গড়ে তুলে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ
# দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রভাব বাড়ানোর অভিযোগ
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি এখনো আদালতে প্রমাণিত নয়। আজাদের ঘনিষ্ঠদের দাবি, এসবই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে ছড়ানো কথা।
বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা
এ বিষয়ে নজরুল ইসলাম আজাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“দলীয় শৃঙ্খলা সবার জন্য সমান। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়—এটাই বার্তা।”
শেষ কথা
মঞ্চের এক মুহূর্তের ঘটনা কীভাবে একজন রাজনীতিকের দীর্ঘদিনের তৈরি করা ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে, নজরুল ইসলাম আজাদের ঘটনা তারই উদাহরণ। এটি নিছক একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য, নাকি রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বড় কোনো বাঁক—তা সময়ই বলে দেবে। তবে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এই ঘটনা যে নতুন করে আলোচনার আগুন জ্বালিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।







Discussion about this post