নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মকর্তাদের অনিয়মের ঘটনায় শাস্তিমূলক বদলির পর সেখানে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে দুর্নীতির অভিযোগে সমালোচিত এক কর্মকর্তার পদায়ন।
গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পদায়ন করায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জোরালো অভিযোগ উঠেছে বিগত সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে এই গুডনাইট বোনের কার্যালয় থেকে অপসারণ করা হয়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আবার এ দুলাল চন্দ্র দেবনাথ কে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে পদায়ন করে জেলা প্রশাসনের শিশু এক কর্মকর্তা।
এমন ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায় শনিবার ৭ মার্চ মধ্যরাতে দুলাল চন্দ্র দেবনাথ ওই কর্মকর্তার ডাকবাংলা থেকে বেরিয়ে আসছেন।
গত বুধবার (৪ মার্চ) সকাল ৯টার দিকে হঠাৎ করে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিদর্শনে আসেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
পরিদর্শনের সময় তিনি অফিসে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে উপস্থিত না পেয়ে প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা করেন। পরে সকাল পৌনে ১০টার দিকে কর্মকর্তারা অফিসে আসেন।
দেরিতে অফিসে আসার কারণ জানতে চাইলে তারা সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হন। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
ঘটনার পরপরই সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন, উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা ওমর ফারুক এবং অফিস সহকারী ফাতেমা জান্নাতিকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।
কিন্তু তাদের বদলির একদিনের মধ্যেই গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের বিতর্কিত সহকারী ভূমি কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পদায়ন করা হলে এলাকাজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুলাল চন্দ্র দেবনাথ দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, গ্রাহক হয়রানি এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তাদের ভাষায়, “চোরের জায়গায় এখন ডাকাত বসানো হয়েছে।”
এলাকাবাসীর দাবি, জমি সংক্রান্ত যেকোনো কাজের জন্য দুলাল চন্দ্র দেবনাথ মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করতেন। চাহিদামতো টাকা না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হতো।
অভিযোগ রয়েছে, অনৈতিক উপায়ে তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। এর আগে নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলি এলাকায় কর্মরত থাকাকালে সেখানকার বাসিন্দাদের ব্যাপক হয়রানির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন এলাকাবাসী।
পরে বিভিন্ন তদবিরের মাধ্যমে দুলাল চন্দ্র দেবনাথ সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি হয়ে আসেন।
সেখানে যোগদানের পরও ঘুষ বাণিজ্য, গ্রাহক হয়রানি এবং একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এমনকি এক নারীকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়।
তৎকালীন জেলা প্রশাসক জাহিদুর আলম অভিযোগটি তদন্তের জন্য এলএ শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মৌসুমি আক্তারকে দায়িত্ব দেন। শুধু ওই নারীই নন, আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী ব্যক্তি দুলাল চন্দ্র দেবনাথের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। তবে রহস্যজনকভাবে এসব অভিযোগের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
কদমতলী এলাকার বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী জানান, প্রায় এক বছর আগে তিনি ক্রয়কৃত চার শতাংশ জমির নামজারি করতে গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান। তখন দুলাল চন্দ্র দেবনাথ তাকে জানান, তার জমি অন্যের নামে নামজারি হয়ে গেছে এবং সেটি সংশোধন করতে ৫ লাখ টাকা লাগবে। কিন্তু ওই টাকা দিতে না পারায় আজও তিনি তার জমির নামজারি করতে পারেননি।
বিল্লাল হোসেনের অভিযোগ, দুলাল চন্দ্র দেবনাথ সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং ঘুষ না দিলে নানা অজুহাতে হয়রানি করেন। তিনি এ ঘটনার বিচার দাবি করেন।
এলাকাবাসীর দাবি, দুলাল চন্দ্র দেবনাথ দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অফিসকে ঘুষ বাণিজ্যের কেন্দ্র বানিয়ে রেখেছেন এবং একটি দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছেন। তার বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ফলে তার “খুঁটির জোর কোথায়”—তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে সিদ্ধিরগঞ্জবাসী নারায়ণগঞ্জের বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের কাছে দুলাল চন্দ্র দেবনাথের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তার পদায়ন বাতিল করে অন্য কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার জোর দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির গণমাধ্যমকে বলেন, দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অস্থায়ীভাবে পদায়ন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে এবং পূর্বে দায়ের করা লিখিত অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো ভূমি কর্মকর্তা যদি অনিয়ম বা অপরাধে জড়িত থাকেন, তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি ভূমি অফিস প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না।








Discussion about this post