নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ এখন যেন জ্বালানি তেল চোরচক্রের অভয়ারণ্য। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিপো ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার লিটার তেল গায়েব করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে—আর প্রশাসনের একাংশের নীরবতায় এই অপকর্ম যেন ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠেছে।
🚨 গোদনাইল থেকে কুর্মিটোলা: ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল উধাও!
সাম্প্রতিক সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনায়, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পদ্মা অয়েল ডিপো থেকে রাজধানীর কুর্মিটোলা ডিপোর উদ্দেশ্যে পাঠানো অন্তত ৪টি লড়ি থেকে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায়।
কাগজে-কলমে এসব তেল গন্তব্যে পৌঁছেছে দেখানো হলেও বাস্তবে তা উধাও—যা প্রমাণ করে কাগুজে হিসাব আর বাস্তবের মধ্যে ভয়াবহ গরমিল।
⚠️ ফতুল্লা: খোলা বাজারেই চোরাই তেলের বেচাকেনা
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড, বুড়িগঙ্গা তীর, ফাজিলপুর, বক্তাবলী, মাসদাইর—প্রায় সর্বত্রই চলছে প্রকাশ্যে চোরাই তেলের বেচাকেনা।
স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত তেল চোর সিন্ডিকেটের সদস্যরা হলেন—
# স্বপন
# কালাম
# হৃদয়
# রনি
# পাগলা রাজু
# ফয়সাল
# কাইল্লা সোহেল
# নাসির উদ্দিন
# জালাল মিয়া
# মাসুদ
# ইকবাল চৌধুরী
এদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব বাহিনী। অভিযোগ রয়েছে, ডিপো থেকে তেল সরানোর পুরো প্রক্রিয়াই এদের নিয়ন্ত্রণে।
🛢️ ডিপোর ভেতরেই চুরির কারখান
তেল চুরির কৌশলও চরম সংগঠিত—
# ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার লড়িতে
# ২০০–৫০০ লিটার অতিরিক্ত তেল ভরে মাঝপথে বিক্রি
# জাহাজ থেকে তেল নামানোর সময় বাল্কহেডে গোপনে সরিয়ে নেওয়া
# কাগজে-কলমে ‘সিস্টেম লস’ বা ‘ট্রান্সপোর্ট লস’ দেখিয়ে হিসাব সমন্বয়
ফলে চুরি হলেও তা ধরা পড়ে না, আর ধরা পড়লেও প্রভাবশালীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
👤 অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ:
কেউ ধরা পড়ে, কেউ থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে
যমুনা ডিপোর কর্মচারী আলী নূর ইসলাম ইমুকে প্রকাশ্যে ডিজেল-অকটেন বিক্রি করতে দেখা গেছে।
একইভাবে—
# সাইফুল ইসলাম (পার্ক এলাকা)
# শেখ শাজাহান (শিবু মার্কেট)
# আয়নাল হক (চাঁনমারী)
# আক্তার হোসেন, আলমগীর মোল্লা (বক্তাবলী)
# হাছান আলী (গুদারাঘাট)
# আলী হোসেন (রাজাপুর)
—এদের বিরুদ্ধেও খোলা বাজারে তেল বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
💰 কোটি টাকার মালিক সিন্ডিকেটের হোতারা
ডিপোর অভ্যন্তরে থাকা কিছু কর্মকর্তা ও সিবিএ নেতাদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে—
# তেল পরিমাপক ও সিবিএ নেতা জয়নাল আবেদীন টুটুল—সোয়া লাখ লিটার তেল গায়েবের অভিযোগে অভিযুক্ত (বরখাস্ত)
# সাবেক কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন—তেল চুরির টাকায় অঢেল সম্পদের মালিক
অভিযোগ রয়েছে, এরা দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে তেল পাচার ও কালোবাজারে সরবরাহের মূল হোতা।
⚖️ বলির পাঁঠা নিম্নপদস্থ কর্মচারী,
রাঘববোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
তদন্তে বারবার দেখা গেছে—
প্রকৃত হোতাদের আড়াল করে নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের বদলি বা সামান্য শাস্তি দিয়ে দায় শেষ করা হচ্ছে।
ফলে সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
📉 সংকটের মধ্যেও কালোবাজারে তেল, তিনগুণ দামে বিক্রি
নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় তেলের সংকট থাকলেও কালোবাজারে চড়া দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে।
ডিপো থেকে তেল সরিয়ে গ্রামাঞ্চলে বেশি দামে বিক্রি করছে চক্রটি—যা সরাসরি সাধারণ জনগণ ও অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
❗ উপসংহার:
প্রশাসনের নীরবতায় ‘তেল চুরি’ এখন প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ
সব মিলিয়ে স্পষ্ট—
নারায়ণগঞ্জের তেল ডিপোগুলো ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত, শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী চোরচক্র।
কাগজে তেল আছে—বাস্তবে নেই।
চুরি ধরা পড়ে—কিন্তু চোর ধরা পড়ে না।
এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে প্রয়োজন—
উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত
জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি
ডিপো ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি
রাজনৈতিক ও সিবিএ প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা
নয়তো “কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই”—এই প্রবাদই হয়ে থাকবে দেশের জ্বালানি খাতের নির্মম বাস্তবতা।









Discussion about this post