নগর প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী তেল চোর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবশেষে প্রশাসনের অভিযান শুরু হলেও, মূল হোতাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
অভিযোগ উঠেছে, সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং চোরাই তেলের ব্যবসার অন্যতম ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মেহেদী ও তার পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ জ্বালানি তেল চুরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মেহেদী পলাতক থাকলেও, তার ছোট ভাই লিটন, বড় ভাই বাচ্চু এবং ভাতিজারা সিন্ডিকেটটি সক্রিয় রেখেছে।
অবৈধ তেলের ব্যবসায় ‘সিন্ডিকেট রাজ’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মেহেদীর মালিকানাধীন “মেসার্স মেহেদী এন্টারপ্রাইজ”-এর আড়ালে বছরের পর বছর ধরে চোরাই তেলের ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে পলাতক মেহেদীর হয়ে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে তার ভাই লিটন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে শুধু তেল চুরি নয়, জাল দলিলের মাধ্যমে জমি দখলসহ নানা অপরাধেও জড়িত এই চক্র। এমনকি লিটন নিজেই বিভিন্ন মহলে দাবি করে বেড়ান, নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করার কারণেই তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না—যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
রাজনৈতিক পোস্টার, নতুন করে সক্রিয়তার ইঙ্গিত
সম্প্রতি সিদ্ধিরগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে “শেখ হাসিনাতেই আস্থা, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান সম্বলিত পোস্টার সাঁটানো হয়। এসব পোস্টারে শেখ হাসিনা, শেখ মুজিবুর রহমান এবং শামীম ওসমানের ছবির পাশাপাশি আনোয়ার হোসেন মেহেদীর ছবিও ব্যবহার করা হয়।
চাষাঢ়া, জেলা পরিষদ, নবীগঞ্জ ঘাট, জালকুড়ি, পুলিশ লাইন, জামতলা ও খানপুর হাসপাতাল এলাকায় রাতের আঁধারে এসব পোস্টার লাগানো হয় বলে জানা গেছে। এমনকি বিএনপির পোস্টারের ওপরেই সেগুলো সাঁটানোর অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পোস্টার লাগানোর পর নিজেরাই স্লোগান দিয়ে ভিডিও ধারণ করছে সংশ্লিষ্টরা।
মামলা থাকলেও জামিনে মুক্তি পেয়ে আড়ালে থেকেই মেহেদী চালাচ্ছে সাম্রাজ্য :
সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল এলাকার বাসিন্দা মেহেদীর বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা রয়েছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় হাফেজ মো. হোসাইন আহম্মেদ (২০) হত্যা চেষ্টা মামলায় তাকে ৬৮ নম্বর আসামি করা হয়। এরপর কিছুদিন কারাগারে বন্দি থেকে জামিন নিয়ে ফ্র আড়ালে থেকে বর্তমানে সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
অবশেষে প্রশাসনের অভিযান: ১৩,৫০০ লিটার ডিজেল জব্দ
এরই মধ্যে শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় সিদ্ধিরগঞ্জের বার্মা স্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালায় প্রশাসন।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফয়েজ উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে “মেহেদী এন্টারপ্রাইজ”-এর নামে অবৈধভাবে মজুতকৃত প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়।
এ সময় বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় দুটি ট্যাংক লরি (নারায়ণগঞ্জ-চ-০১-০০২৯ এবং পিরোজপুর-ঢ-৪১-০০৪৮) জব্দ করা হয় এবং জ্বালানি সরবরাহে ব্যবহৃত ফিলিং স্টেশনের মিটার সিলগালা করা হয়।
অভিযানে জড়িত দুই কর্মচারী—মো. জসিম (৩৮) ও মোহাম্মদ হোসেন ভূঁইয়া (৩০)—কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
প্রশ্নের মুখে প্রশাসন, ক্ষোভে ফুঁসছে জনতা
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—যেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে একটি চক্র তেল চুরি, অবৈধ ব্যবসা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছে, সেখানে মূল হোতারা এখনও অধরা কেন ?
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহতদের স্বজনরা অভিযোগ করে বলেছেন, একটি চিহ্নিত সিন্ডিকেট প্রকাশ্যে পতিত রাজনৈতিক শক্তিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে, অথচ প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ সীমাবদ্ধ রয়েছে কেবল নিম্নস্তরের কর্মচারীদের গ্রেপ্তারে।
তাদের দাবি, অবিলম্বে এই তেল চোর সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে—নচেৎ সিদ্ধিরগঞ্জে অপরাধচক্রের দৌরাত্ম্য আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।









Discussion about this post