নগর প্রতিনিধি :
ছোট শহর হলেও দুর্ভোগে ভরা নারায়ণগঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরে এ শহরের অন্যতম বড় সমস্যা ছিল ফুটপাত দখল আর এর আড়ালে চলা সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি।
দিনের শুরু থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান সড়ক ও ফুটপাত ছিল হকারদের দখলে, আর সেই দখলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থ লেনদেনের এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকাশ্যে হকার বসালেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ছিল ‘মহাজন’ নামে পরিচিত এক শ্রেণির দখলদারদের হাতে। ফুটপাতে বসা অধিকাংশ দোকানি ছিলেন দৈনিক মজুরির কর্মচারী—প্রতিদিন ৫০০ টাকায় কাজ করা এসব মানুষ ছিলেন কেবল মুখোশ।
আর পর্দার আড়ালে থেকে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী অসাধু ব্যক্তিরা নিয়মিত আদায় করতেন মোটা অঙ্কের চাঁদা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ছিল একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক অপরাধচক্র, যেখানে ফুটপাত দখল শুধু বাহ্যিক চিত্র—মূল খেলা ছিল চাঁদাবাজি।
বছরের পর বছর ধরে এই চক্র এতটাই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে যে, বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ভেস্তে যায়।
এমনকি সাবেক মেয়র ডা. আইভীর একাধিক প্রচেষ্টাও এই চাঁদাবাজ চকলেট গডফাদার শামীম ওসমানের শক্তির কাছে ব্যর্থ হয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় রাজনৈতিক পালাবদলের পরও।
অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সুযোগে নতুন একটি চক্র একই কায়দায় চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নেয়। তারা প্রকাশ্যে না এলেও “দড়ি মাছ না ছুঁই পানি” কৌশলে কোটি টাকার অবৈধ চাঁদা হাতিয়ে নেয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের কঠোর ঘোষণার পর ফুটপাত দখলদারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আর চাঁদা আদায়কারী চক্র নিজেদের মুখো চুম্মোচনের ভয়ে ফুটপাত উচ্ছেদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন।
আর উচ্ছেদ অভিযানের আগেই হকাররা স্বেচ্ছায় ফুটপাত ছেড়ে দেন—যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকাল থেকে শহরের চাষাড়া, কালিরবাজার ও বঙ্গবন্ধু সড়ক এলাকায় দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। যেখানে আগে হাঁটা দায় ছিল, সেখানে এখন নির্বিঘ্নে চলাচল করছেন পথচারীরা। দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এটি প্রমাণ করে—হকাররা মূল সমস্যা ছিল না, বরং তাদের আড়ালে থাকা চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটই ছিল আসল শক্তি।
প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের খবর পেতেই সেই সিন্ডিকেট পিছু হটেছে।
এ বিষয়ে প্রশাসক বলেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আর কোনো হকার বসতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে প্রকৃত হকারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যেখানে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তবে সচেতন মহল মনে করছে, শুধু উচ্ছেদ নয়—এই চাঁদাবাজ চক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। না হলে সময়ের ব্যবধানে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে একই চক্র, আর পুনরায় জিম্মি হবে শহরের সাধারণ মানুষ।
শেষ কথা:
ফুটপাত এখন খালি, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—চাঁদাবাজির সেই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক কি সত্যিই ভেঙে গেছে, নাকি আবার সুযোগের অপেক্ষায় ?**









Discussion about this post