নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
‘বিদ্যুৎ বিল কমবে, খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকবে’—এমন প্রত্যাশা নিয়ে দেশে প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার বিস্তার ঘটলেও নারায়ণগঞ্জে উল্টো ক্ষোভ বাড়ছে গ্রাহকদের মধ্যে। প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ করার পর প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত টাকা শেষ হয়ে যাওয়া, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া, ভ্যাট ও বিদ্যুতের স্ল্যাবভিত্তিক মূল্য নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন গ্রাহকেরা।
অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে এবার মাঠে নেমেছে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক অধিকার ফোরাম।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে প্রিপেইড মিটার স্থাপন বন্ধ, ইতোমধ্যে স্থাপন করা মিটার প্রত্যাহার এবং অতিরিক্ত বিল বাতিলের দাবিতে তিন ঘণ্টার গণঅনশন পালন করে সংগঠনটি।
সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলা কর্মসূচিতে নাগরিক অধিকার ফোরামের নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার পঞ্চায়েত, মসজিদ কমিটি ও দোকান মালিক সমিতির প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
‘দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে’
গণঅনশনে নাগরিক অধিকার ফোরামের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল অভিযোগ করেন, প্রিপেইড মিটার গ্রাহকদের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্ল্যাবের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। প্রিপেইড মিটার বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন।
এর আগে ১১ আগস্ট চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সমাবেশ ও গণমিছিল থেকেও সংগঠনটি একই ধরনের অভিযোগ তোলে। তাদের দাবি, গ্রাহকদের না জানিয়ে বা যথেষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে অনেক এলাকায় পুরোনো মিটার খুলে প্রিপেইড মিটার বসানো হচ্ছে। একই সঙ্গে স্ল্যাবের কারণে প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় বিল বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
অভিযোগের মাত্রা বোঝাতে সংগঠনটির নেতারা দাবি করেছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। তবে এসব দাবির পক্ষে কতজন গ্রাহকের কত মাসের বিল বা রিচার্জের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তার বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে দেওয়া হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এখনো প্রয়োজন।
আসলে প্রিপেইড মিটারে টাকা কাটে কীভাবে ?
গ্রাহকদের অভিযোগের বড় অংশ তৈরি হচ্ছে রিচার্জের পর ব্যালেন্স দ্রুত কমে যাওয়া নিয়ে। এখানে শুধু ব্যবহৃত ইউনিটের দাম নয়, অন্যান্য নির্ধারিত চার্জও বিবেচনায় আসে।
নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে অনুমোদিত লোডের বিপরীতে প্রতি কিলোওয়াট মাসে ৪২ টাকা হারে ডিমান্ড চার্জ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মিটার ভাড়া কাটা হয়। ভ্যাটও প্রযোজ্য। কোনো মাসে রিচার্জ না করলে পরবর্তী রিচার্জের সময় আগের মাসগুলোর অপরিশোধিত ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া একসঙ্গে কেটে নেওয়া হতে পারে।
অর্থাৎ একজন গ্রাহক ৩ হাজার টাকা রিচার্জ করলেও পুরো ৩ হাজার টাকা বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য হাতে থাকে না। উদাহরণ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ নিজেই দেখিয়েছে—৩ কিলোওয়াটের সিঙ্গেল-ফেজ আবাসিক গ্রাহক ৩ হাজার টাকা রিচার্জ করলে ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া বাদ দেওয়ার পর এবং রিবেট যোগ করার পর ব্যবহারযোগ্য এনার্জি ব্যালেন্স থাকে প্রায় ২ হাজার ৭০৫ টাকা।
এখানেই গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তির একটি জায়গা তৈরি হতে পারে। অনেক গ্রাহক রিচার্জের পুরো অর্থকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের টাকা হিসেবে বিবেচনা করলেও বাস্তবে নির্ধারিত অন্যান্য চার্জও একই রিচার্জ থেকে কেটে নেওয়া হয়।
স্ল্যাব কি প্রিপেইড মিটারের জন্য আলাদা ?
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার প্রকাশিত তথ্য বলছে, প্রিপেইড মিটারে ব্যবহারের ওপর বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে প্রচলিত আবাসিক স্ল্যাবই প্রযোজ্য। ডিপিডিসির প্রকাশিত বর্তমান ট্যারিফ তালিকায় আবাসিক গ্রাহকের জন্য ০-৫০ ইউনিট ‘লাইফ লাইন’সহ ৭৫, ২০০, ৩০০, ৪০০, ৬০০ এবং ৬০১ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের জন্য পৃথক ধাপ রয়েছে। একই তালিকায় ডিমান্ড চার্জ প্রতি কিলোওয়াটে মাসে ৪২ টাকা দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ তাদের গ্রাহক নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলেছে, প্রিপেইড মিটারে পোস্টপেইড মিটারের তুলনায় ইউনিটপ্রতি আলাদা মূল্য হওয়ার কথা নয়; পোস্টপেইড মিটারে যে মূল্য তালিকা অনুসারে হিসাব হয়, প্রিপেইড মিটারেও সেই মূল্য কাঠামো ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো—গ্রাহকের হাতে থাকা টাকার পরিমাণ এত দ্রুত কমছে কেন?
এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম নয়, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া, ভ্যাট, মাসভিত্তিক স্ল্যাব এবং আগের বকেয়া চার্জ—সবকিছু একসঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে।
গ্রাহকদের অভিযোগের জায়গাটি কোথায় ?
নাগরিক অধিকার ফোরামের অভিযোগ মূলত প্রিপেইড মিটারের হিসাব পদ্ধতির স্বচ্ছতা ও গ্রাহকবান্ধবতা নিয়ে। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, অনেক গ্রাহক বুঝতেই পারছেন না রিচার্জ করা অর্থের কত অংশ বিদ্যুৎ ব্যবহারে যাচ্ছে এবং কত অংশ বিভিন্ন চার্জ হিসেবে কেটে নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে মাসের প্রথম রিচার্জে একাধিক চার্জ কেটে নেওয়া হলে গ্রাহকের কাছে মনে হতে পারে, মিটার অস্বাভাবিক হারে টাকা খরচ করছে। আবার কোনো মাসে রিচার্জ না করার পর পরবর্তী রিচার্জে একাধিক মাসের বকেয়া ডিমান্ড চার্জ বা মিটার ভাড়া কেটে নেওয়া হলে হঠাৎ বড় অঙ্কের টাকা কমে যেতে পারে। নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর নিজস্ব নির্দেশনাতেও এমন কর্তনের কথা উল্লেখ আছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে গ্রাহকদের অভিযোগ ভিত্তিহীন বা প্রিপেইড মিটারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কয়েক গুণ বেশি বিল নেওয়া হচ্ছে। বরং কোনো নির্দিষ্ট গ্রাহকের ক্ষেত্রে অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য তার আগের মিটার ও বর্তমান প্রিপেইড মিটারের একই সময়ের ব্যবহার, অনুমোদিত লোড, রিচার্জ ইতিহাস, ইউনিট ব্যবহার এবং কর্তনের খাত তুলনা করা জরুরি।
আন্দোলন কেন বাড়ছে ?
নারায়ণগঞ্জে প্রিপেইড মিটারবিরোধী আন্দোলন এক দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নেই। জুনে ‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’ নামের একটি সামাজিক সংগঠনও প্রিপেইড মিটার স্থাপন বন্ধ ও বর্ধিত বিল প্রত্যাহারের দাবিতে গণঅবস্থান ও মানববন্ধন করে।
এরপর জুলাইয়ের শেষদিকে নাগরিক অধিকার ফোরামের উদ্যোগে সভা, আগস্টের শুরুতে সিদ্ধিরগঞ্জে মতবিনিময়, ১১ আগস্ট গণমিছিল এবং সর্বশেষ ২৫ আগস্ট গণঅনশন অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ বিষয়টি ধীরে ধীরে কয়েকটি এলাকার গ্রাহকের অসন্তোষ থেকে বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে।
১১ আগস্টের কর্মসূচি থেকেই সংগঠনটি জানিয়েছিল, তারা ২৫ আগস্ট গণঅবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকার বিদ্যুৎ ভবনে কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
এমপির আশ্বাসে ভাঙল অনশন
মঙ্গলবারের গণঅনশনে সংহতি জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপনের আশ্বাস দেন। পরে অনশনকারীদের পানি পান করিয়ে কর্মসূচি শেষ করেন তিনি।
ফলে এখন আন্দোলনকারীদের দাবি ও সংসদ সদস্যের আশ্বাসের পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অভিযোগের নিরপেক্ষ অডিট হবে কি ?
প্রিপেইড মিটার নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বিতর্কের সমাধান শুধু মিটার খুলে ফেলা বা আন্দোলনকারীদের দাবি প্রত্যাখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন গ্রাহকের অভিযোগের স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ যাচাই।
একই এলাকার একই ধরনের বাসাবাড়ির পুরোনো ও প্রিপেইড মিটারের অন্তত ছয় মাসের ব্যবহার, রিচার্জ, ইউনিটপ্রতি ব্যয়, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া, ভ্যাট ও অন্যান্য কর্তনের হিসাব প্রকাশ্যে তুলনা করা হলে প্রকৃত চিত্র অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত গ্রাহকের রিচার্জের অর্থ থেকে কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তা সহজ ভাষায় এবং স্পষ্টভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা। কারণ প্রিপেইড ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য যদি হয় গ্রাহককে নিজের বিদ্যুৎ ব্যবহার সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা দেওয়া, তাহলে হিসাবের স্বচ্ছতাই হওয়া উচিত এর প্রথম শর্ত।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনও ২০২৬ সালের জুনে বিদ্যুতের খুচরা মূল্যহার সংশোধনসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। ফলে বর্তমানে কার্যকর মূল্যহার ও নারায়ণগঞ্জের গ্রাহকদের কাছ থেকে বাস্তবে কীভাবে অর্থ কাটা হচ্ছে—এ দুটির মধ্যে কোনো অসঙ্গতি আছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন তাই শুধু ‘প্রিপেইড মিটার থাকবে কি থাকবে না’—এটি নয়। প্রশ্ন হলো, একজন গ্রাহক যে টাকা বিদ্যুৎ কিনতে দিচ্ছেন, তার প্রতিটি টাকা কোন খাতে যাচ্ছে—সেই হিসাব কি তিনি সহজে বুঝতে পারছেন?
নারায়ণগঞ্জের চলমান আন্দোলন মূলত সেই হিসাবের স্বচ্ছতার দাবিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দায়িত্ব বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও জনপ্রতিনিধিদের—অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে তথ্য-উপাত্ত প্রকাশের মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।









Discussion about this post