গণপতি চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডে ‘জজ মিয়া নাটকের’ আশঙ্কা, নারায়ণগঞ্জে সাংস্কৃতিক জোটের মানববন্ধন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ :
রংপুরে সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাসহ সপরিবারে হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের দাবি জানিয়েছে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ঘটনায় তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে কাউকে রক্ষার চেষ্টা করা হলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বক্তারা। পাশাপাশি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর হামলাকারী ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে আয়োজিত প্রতিবাদী মানববন্ধনে এসব দাবি উঠে আসে।
সংগঠনের সভাপতি মনি সুপান্থের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক দিনা তাজরীনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, কবি ও সাংবাদিক হালিম আজাদ, শিশু সংগঠক রথীন চক্রবর্তী, সিপিবি নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি শিবনাথ চক্রবর্তী, সংগঠনের উপদেষ্টা ভবানী শংকর রায় ও প্রদীপ ঘোষ বাবু, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক দীপু, বাসদ নারায়ণগঞ্জ জেলা সদস্য সচিব আবু নাঈম খান বিপ্লব, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি মাহমুদ হোসেন, শিল্পী অমল আকাশ এবং সামাজিক সংগঠন সমমনার উপদেষ্টা দুলাল সাহা।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, একটি পরিবারের চার সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দেশের নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। এমন একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সামান্য অসঙ্গতি, বিভ্রান্তি কিংবা পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও জনমনে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। তাই প্রকৃত ঘটনা আড়াল নয়, স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্য প্রকাশ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, রংপুরের চার হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের নানামুখী ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ইতোমধ্যে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। গণপতি চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও অতীতের মতো কোনো ‘জজ মিয়া নাটক’ সাজিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেই আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “সরকার যদি এ হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন দিকে নিয়ে গিয়ে কাউকে রক্ষা করার পথে যায়, তা সরকারের জন্য ভালো হবে না।”
রফিউর রাব্বি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর ঘটনায় তদন্তের নামে ধোঁয়াশা তৈরি হলে কিংবা প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে সাজানো কোনো কাহিনি দাঁড় করানোর চেষ্টা হলে জনগণের আস্থা আরও গভীর সংকটে পড়বে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সত্য উদঘাটন করা, সত্যকে চাপা দেওয়া নয়।
দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ধর্ম রক্ষার নামে একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী ক্রমেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এসব গোষ্ঠী দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার পরিবেশ তৈরি করছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের নীরবতা ও নমনীয়তা উগ্রবাদীদের আরও সাহসী করে তুলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে রফিউর রাব্বি বলেন, এ ধরনের বক্তব্য সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা কারও কাছ থেকে তা প্রত্যাশিত নয়। কোনো অঞ্চলকে কার্যত আলাদা ভূখণ্ডের মতো বিবেচনা করার সুযোগ নেই। দেশের প্রতিটি নাগরিক, প্রতিটি অঞ্চল এবং দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই সমানভাবে নিতে হবে।
তিনি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তাবিরোধী সব ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দাবি করেন।
কবি ও সাংবাদিক হালিম আজাদ বলেন, গত ছয় মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন, সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাকে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই ধামাচাপা দেওয়া যাবে না। তদন্তের নামে বিভ্রান্তি সৃষ্টি বা প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষার যেকোনো চেষ্টা জনমনে আরও ক্ষোভ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করবে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনাকারী, সহযোগী এবং প্রত্যক্ষভাবে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তাদের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত হতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, পেশাদার ও স্বচ্ছ। তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অস্পষ্টতা না রেখে জনগণের সামনে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য তুলে ধরতে হবে এবং বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘসূত্রতার ফাঁদে ফেলে অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
একই সঙ্গে ধর্মের নামে সহিংসতা, ভয়ভীতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানো উগ্রবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
বক্তাদের ভাষ্য, একটি সপরিবার হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু চারজন মানুষের হত্যার বিচার নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনের শাসন, তদন্ত ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় ব্যর্থতার কোনো সুযোগ নেই।








Discussion about this post