নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রুটে দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন
৫২ কিলোমিটার রুটে বদলে যাবে রেল যোগাযোগ, কমবে যাতায়াতের সময় ও ব্যয়
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
দেশের রেল যোগাযোগে নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জকে ঘিরে। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর ৫২ কিলোমিটার রেলপথে প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ লক্ষ্যে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামী বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) থেকে ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা উন্নয়ন সহায়তা পাওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ২০৩১ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চল নারায়ণগঞ্জের যোগাযোগে এই প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছে রেলওয়ে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় যাতায়াত করেন। সড়কপথের দীর্ঘ যানজট ও অতিরিক্ত গাড়ির চাপের কারণে এসব যাত্রায় সময় ও ভোগান্তি দুটিই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনগুলো মূলত ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল। পুরোনো প্রযুক্তির এসব ইঞ্জিনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত গতিতে ট্রেন চালানো এবং যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ট্রিপ পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটের রেল পরিচালনা ব্যবস্থা ডিজেল থেকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হবে। রেললাইনের ওপর স্থাপন করা হবে ওভারহেড বৈদ্যুতিক তার। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হবে ট্রাকশন সাবস্টেশন।
এ ছাড়া আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) ট্রেন, বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন এবং কম্পিউটারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা ও দক্ষতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি প্রস্তাবনা অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক ট্রেন ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। কার্বন নিঃসরণও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈদ্যুতিক ট্রেন দ্রুত গতি অর্জন ও দ্রুত থামতে সক্ষম হওয়ায় স্টেশনে যাত্রাবিরতির পর কম সময়ে কাঙ্ক্ষিত গতিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। ফলে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে যাতায়াতের সময় অর্ধেকের বেশি কমে আসতে পারে বলে প্রকল্প প্রস্তাবনায় আশা করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রেলপথ শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়, রাজধানীর সঙ্গে দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই রুটের আধুনিকায়ন হলে সড়কপথের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ৩ হাজার ৯৩ কিলোমিটার নেটওয়ার্কে ডিজেলচালিত ট্রেন চলছে। প্রতিবেশী ভারত ইতোমধ্যে তাদের ব্রডগেজ রেল নেটওয়ার্কের বড় অংশ বিদ্যুতায়ন করেছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশেও রেল বিদ্যুতায়নের উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের পর ঢাকা-চট্টগ্রামেও বৈদ্যুতিক ট্রেন
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বৈদ্যুতিক ট্রাকশন চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশার কাজ শেষ হয়েছে।
অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর ওই প্রকল্পের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি।
তবে সবকিছুর আগে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন ধাপ পার হতে হবে। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে রাজধানীর রেল যোগাযোগে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার পাশাপাশি দেশের রেল ব্যবস্থায় বিদ্যুতায়নের প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।









Discussion about this post