নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্য: আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানে নতুন প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক :
একদিকে নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন ঘিরে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ, অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডার থেকে কমিশন আদায়ের অভিযোগ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এই বিস্তর অভিযোগের তালিকায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক)-এর টেন্ডার ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—নাসিকের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও দরপত্রে কারা সুবিধা নিয়েছে, কীভাবে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল এবং অভিযোগে উল্লিখিত কমিশনের অর্থ কোথায় গেছে?
দুদকের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গে আসিফ মাহমুদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। দুদকের অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে।
নাসিকের টেন্ডার: কারা ছিল সুবিধাভোগী ?
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরী। প্রতিবছর এ প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে সড়ক, ড্রেনেজ, পানি নিষ্কাশন, অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন উন্নয়নকাজে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। এসব কাজের বড় অংশই টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা।
কিন্তু সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানে নাসিকের টেন্ডার বাণিজ্যের প্রসঙ্গ উঠে আসায় এখন নতুন করে সামনে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন—নাসিকের উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল?
কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, প্রাক্কলিত ব্যয় কত ছিল, কারা টেন্ডারে অংশ নিয়েছে, কারা কাজ পেয়েছে এবং কাজের বিপরীতে প্রকৃত ব্যয় কত—এসব তথ্য খতিয়ে দেখা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষ করে টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ সত্য হলে, সেই কমিশন কীভাবে আদায় করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে নাসিকের কোনো কর্মকর্তা, ঠিকাদার বা প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা ছিল কি না—সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
দুদকের অনুসন্ধানে নাসিক—উঠছে আরও প্রশ্ন
অভিযোগে শুধু টেন্ডার নয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
অভিযোগের পরিধি যখন এত বিস্তৃত, তখন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের কোনো কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে—
- কোন সময়ে নাসিকের কোন বড় প্রকল্পের টেন্ডার হয়েছে;
- প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ও পরবর্তী সংশোধিত ব্যয়ের পার্থক্য কত;
- একই ঠিকাদার বা প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পেয়েছে কি না;
- দরপত্রে প্রতিযোগিতা প্রকৃত ছিল কি না;
- কাজের মান ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না;
- প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো হয়েছিল কি না—
এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়োগ-পদায়নের অভিযোগের পর টেন্ডারেও নজর
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। সেখানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি এবং কেনাকাটা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগের কথা বলা হয়।
নতুন অভিযোগের সঙ্গে আগের অভিযোগ সংযুক্ত করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখন অনুসন্ধানের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
অর্থাৎ বিষয়টি আর কোনো একটি মন্ত্রণালয়ের সীমাবদ্ধ অভিযোগে আটকে নেই। নিয়োগ থেকে টেন্ডার, প্রকল্প থেকে পদায়ন—একাধিক খাতের আর্থিক লেনদেনের একটি সম্ভাব্য চিত্র যাচাই করছে দুদক।
বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
অভিযোগের সবচেয়ে বড় অংশ বিদেশে অর্থপাচরকে ঘিরে। দুদকের অনুসন্ধানে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে—মোট ১১ হাজার কোটি টাকা।
অভিযোগে এসব অর্থ দিয়ে বিদেশে ভিলা কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগের কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে এখন মূল প্রশ্ন—টেন্ডার সিন্ডিকেট কোথায় ?
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়, সেটি নির্ধারণ করবে দুদকের অনুসন্ধান। তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ সামনে আসায় স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ জনগণের অর্থ। সেই অর্থের একটি অংশ যদি কমিশন, সিন্ডিকেট বা অবৈধ লেনদেনে চলে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারায়ণগঞ্জের নাগরিকরাই।
তাই শুধু একজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই করলেই হবে না—নাসিকের কোন টেন্ডারে কী ঘটেছিল, কারা কাজ পেয়েছিল, কত টাকা ব্যয় হয়েছিল এবং অর্থের প্রতিটি ধাপের হিসাব কোথায়—সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় আসা প্রয়োজন।
দুদকের অনুসন্ধান শেষ হলে অভিযোগগুলো কতটা সত্য, কতটা অতিরঞ্জিত এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত—তারই উত্তর মিলবে। আর সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্য ছিল নিছক অভিযোগ, নাকি এর আড়ালে সত্যিই সক্রিয় ছিল কোনো প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।








Discussion about this post