১১৭০ টাকার নামজারিতে ‘লন্ডনকাণ্ড’!
দুলাল দেবনাথের কথিত অডিওতে ‘উপর মহল’, ‘দুই টেবিল’ ও তারেক রহমানের নাম—তদন্তের দাবি
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
নামজারির সরকারি ফি মাত্র ১ হাজার ১৭০ টাকা। অথচ সেই সরকারি সেবা ঘিরে কখনো নগদ টাকা, কখনো জমির অংশ দাবি—এমন অভিযোগে বারবার আলোচনায় আসছেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র দেবনাথ।
এবার অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বিস্ফোরক একটি কথিত অডিও—যেখানে ‘উপর মহলকে ম্যানেজ’, ‘দুই টেবিল খুশি রাখা’ এবং লন্ডনে টাকা যাওয়ার প্রসঙ্গসহ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বর্তমান প্ররধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম উচ্চারণের দাবি করা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নামজারির জন্য নির্ধারিত ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা—আবেদন ফি, নোটিশ জারি, রেকর্ড সংশোধন ও খতিয়ান সরবরাহের নির্ধারিত ফি মিলিয়ে এই অর্থ নেওয়া হয়।
‘বদলি করলেও দুই মাসে ফিরে আসব’—কথিত অডিওতে দাবি
সাংবাদিকদের হাতে আসা কথিত অডিওতে দুলাল দেবনাথের কণ্ঠ হিসেবে দাবি করা ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়—তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে বদলি করা হলেও ‘উপর মহলে’ অর্থ খরচ করে মাত্র দুই মাসের মধ্যে আবার ফিরে আসা সম্ভব।
একই কথোপকথনে ‘উপর মহলকে ম্যানেজ’ করার প্রসঙ্গ এবং ‘দুইটা টেবিল খুশি রাখতে হয়’—এমন বক্তব্যও রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এই বক্তব্য সত্য হলে প্রশ্ন উঠছে—কোন দুই টেবিলের কথা বলা হয়েছে? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যের অর্থ কি ঊর্ধ্বতন ভূমি প্রশাসনের কোনো পর্যায়ে অর্থ দেওয়ার ইঙ্গিত? নাকি এটি নিছক ব্যক্তিগত দাবি বা কথোপকথনের অংশ?
এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে অডিওটির ফরেনসিক পরীক্ষা, কথোপকথনের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট নামজারি ফাইল এবং বদলি-পদায়নের সরকারি নথি একসঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
‘টাকা লন্ডনে যায়’, এরপর তারেক রহমানের নাম
সবচেয়ে আলোচিত অংশটি এসেছে কথিত অডিওর শেষদিকে। সেখানে দুলাল দেবনাথের কণ্ঠ হিসেবে দাবি করা ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়—ভূমি সেবার মাধ্যমে আয় করা টাকা ‘লন্ডনেও যায়’ এবং লন্ডনে থাকা এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমানের নাম উচ্চারণ করা হয়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: এই বক্তব্য থেকে তারেক রহমান বা লন্ডনে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তির কাছে বাস্তবে অর্থ পাঠানো হয়েছে—এমন কোনো স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। অডিওতে নাম উচ্চারণ এবং বাস্তবে অর্থ লেনদেন—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
তাই কথিত অডিওর এই অংশ এখন সবচেয়ে বেশি তদন্তের দাবি রাখে। সত্যিই যদি এমন অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে, তার ব্যাংকিং রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য থেকেই তা যাচাই করা সম্ভব।
৭৩ শতাংশ জমির নামজারিতে ১০ শতাংশ জমি চাওয়ার অভিযোগ
সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুলাল দেবনাথের বিরুদ্ধে ৭৩ শতাংশ ভিটি জমির নামজারি করে দেওয়ার বিনিময়ে প্রথমে ১০ শতাংশ জমি দাবি এবং পরে সাড়ে ৭ শতাংশ জমিতে সমঝোতার অভিযোগ এসেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই কথিত অডিওটি সামনে আসে।
সরকারি নামজারি ফি যেখানে ১ হাজার ১৭০ টাকা, সেখানে জমির অংশ দাবি করার অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি সাধারণ অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগের চেয়ে অনেক গুরুতর হয়ে দাঁড়ায়।
এ কারণেই ওই নামজারি আবেদনের নথি, সংশ্লিষ্ট জমির দলিল, আবেদনকারীর বক্তব্য, অফিসের নথি এবং কথিত অডিও—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
পুরোনো অভিযোগও কম নয়
দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে ঘিরে এর আগেও ঘুষ ও সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে সিদ্ধিরগঞ্জে তার পদায়ন নিয়েও স্থানীয়দের ক্ষোভের কথা প্রকাশিত হয়।
এপ্রিলের একটি প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে ভূমি অফিসে দালালনির্ভরতার অভিযোগও প্রকাশিত হয় এবং সেখানে তাকে দালাল প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
তবে এসব প্রকাশিত অভিযোগের প্রতিটির স্বাধীন সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রকাশিত হওয়া আর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
ফেসবুকে একের পর এক অভিযোগ
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কয়েকজন ব্যক্তি দুলাল দেবনাথের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন ও জমির নামজারি নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন।
ফেরদৌসি আক্তার রেহেনা নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী দাবি করেছেন, তার একটি জমির নামজারির জন্য প্রথমে ৫ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল এবং পরে ২ লাখ টাকায় কাজ করে দেওয়ার কথা বলা হয়। তিনি দাবি করেন, শেষ পর্যন্ত তিনি কোনো টাকা দেননি।
ফারুক আহম্মেদ নামে আরেক ব্যক্তি দাবি করেছেন, তিনি দুলাল দেবনাথকে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছেন।
আবার মোশারফ হোসেন খান নামের এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে দাবি করেছেন, দুলাল দেবনাথ সিদ্ধিরগঞ্জে পদায়ন পেতে ২০ লাখ টাকা খরচের কথা কোথাও বলেছেন।
এসব বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিযোগ মাত্র। এগুলোর সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লিখিত অভিযোগ, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, কল রেকর্ড, ব্যাংক হিসাব বা অন্য কোনো স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন।
সম্পদের হিসাবও কি খতিয়ে দেখা হবে ?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেক মন্তব্যে দুলাল দেবনাথের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে একাধিক বাড়ি, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং কলেজ রোড এলাকায় ফ্ল্যাট কেনার দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা বা বৈধ উৎসের বিষয়ে এই প্রতিবেদনের হাতে সরকারি নথি নেই। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে নয়, তদন্তযোগ্য অভিযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
দুদক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের রেজিস্ট্রি এবং নিকটাত্মীয়দের নামে থাকা সম্পদের তথ্য যাচাই করতে পারে।
মামলা চলমান থাকার দাবিও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন
দুলাল চন্দ্র দেবনাথের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ আমলী আদালতে জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলা চলমান এবং মামলাটি সিআইডিতে তদন্তাধীন—এমন দাবি করা হয়েছে। তবে এই মামলার বর্তমান অবস্থা, মামলা নম্বর ও তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি আদালতের নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
নতুন এসিল্যান্ডের বক্তব্য
নবনিযুক্ত সিদ্ধিরগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তারেক আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি ওই দিনই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে প্রতিবেদকের কাছ থেকেই প্রথম জানতে পেরেছেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানান।
এখন সামনে কয়েকটি বড় প্রশ্ন
দুলাল দেবনাথের কথিত অডিও সত্য হলে ‘উপর মহল’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে?
‘দুই টেবিল খুশি রাখা’র কথার সঙ্গে কোনো বাস্তব আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক আছে কি?
নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে একই জেলার বিভিন্ন ভূমি অফিসে তার দায়িত্ব পালনের সরকারি নথি কী বলে?
বদলি হয়ে থাকলে তিনি কীভাবে আবার নারায়ণগঞ্জে ফিরে এসেছেন?
কথিত অডিওতে লন্ডনে টাকা যাওয়ার যে বক্তব্য এবং তারেক রহমানের নাম এসেছে, সেটি কি কেবল কথার কথা, নাকি এর পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নামজারির সরকারি ফি যেখানে ১ হাজার ১৭০ টাকা, সেখানে ৭৩ শতাংশ জমির নামজারির বিনিময়ে জমির অংশ দাবি করার অভিযোগের সত্যতা কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে প্রয়োজন অডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা, অভিযোগকারীর জবানবন্দি, নামজারি নথি, বদলি-পদায়নের রেকর্ড, সম্পদের হিসাব এবং কথিত আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান।
অভিযোগ সত্য হলে শুধু একজন ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, কথিত ‘উপর মহল’ পর্যন্ত তদন্তের পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া উচিত।
জনসেবার জন্য তৈরি ভূমি অফিসে ১ হাজার ১৭০ টাকার সরকারি সেবাকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার অভিযোগ এবং কথিত ‘লন্ডন-সংযোগ’—এখন তদন্তের বল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোর্টে।









Discussion about this post