‘অবৈধ সম্পর্কের জেরে নারায়ণঞ্জের ফতুল্লার চাঁদ ডাইংয়ের কর্ণধার শিল্পপতি জসিম উদ্দিন মাসুমকে (৫৯) ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের ঘটনায় পরকীয়া প্রেমিকা রুমা ও তার বন্ধবী রোকসানা ওরফে রুকু ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন নারায়ণগঞ্জ আদালতের সিনিয়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হায়দার আলী।
স্বেচ্ছায় এবং অকপটেই হত্যাকান্ডের সকল তথ্য বিজ্ঞ বিচারকের খাস কামড়ায় স্বীকার করেন রুমা ও রুকু ।
১১ টুকরা করে শিল্পপতি জসিম উদ্দিন মাসুমকে হত্যা ও লাশ ফেলে দিতে রুমাকে সহায়তা করে তারই বান্ধবী মডেল রোকসানা ওরফে রুকু ।
শুক্রবার (১৫ নভেম্বর) বিকেলে এমন ঘটনা আদালতে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন নারায়ণগঞ্জ আদালত পুলিশের পরিদর্শক মো. কাইয়ুম খান ।

পরকীয়া প্রেমিকা রুমা ও তার বন্ধবী রোকসানা ওরফে রুকু ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিতে ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করেন ।
ঘাতক রুমা আক্তার (২৮) ময়মনসিংহের গৌরিপুর থানার তাতরাকান্দা গ্রামের নজর আলীর মেয়ে। তার বান্ধবী রোকসানা ওরফে রুকু (২৬) ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া থানার কানিকশালগাঁও গ্রামের মৃত আবদুল হকের মেয়ে।
স্বীকারোক্তি দেয়া দুজনই রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকার ডা. হাবিবুল্লাহর বাড়ির ভাড়াটিয়া।
আদালত সূত্র থেকে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচলের লেক থেকে বুধবার (১৩ নভেম্বর) তিনটি পলিথিনে মোড়ানো মাসুমের সাত (৭) টুকরা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয় আইনশৃংখলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা।
শিল্পপতি জসিম উদ্দিন মাসুম হত্যাকান্ডের ঘটনায় কাফরুল থেকে রুমা, রুকুসহ চার জনকে আটক করা হয়েছে। পরে রূপগঞ্জ থানায় হওয়া হত্যা মামলায় থেকে রুমা ও রুকু গ্রেপ্তার দেখিয়ে বাকি দুজনকে ছেড়ে দেয়া হয়।
নির্মম এমন হত্যাকান্ডের মামলায় তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একজন পুলিশ কর্মকর্তা গণমাধ্যমে বলেন, হত্যার পর কাফরুলের বাসায় ছিলেন রুমা। কোন ধরনের টেনশন ছাড়াই চলাফেরা ও ঘুমাতে থাকেন রুমা। বুধবার রাতে পুলিশ তাকে ঘুম থেকে তুলে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ঘটনার সবকিছুই অকপটে স্বীকার করেন রুমা।
কিভাবে এই হত্যাকান্ড ঘটায় তার বর্ণনা দেন রুমা :
রুমা দাবি, কাফরুলের তিনটি কক্ষের একটি ফ্ল্যাট নিয়ে তার ছোট বোন, বান্ধবী, ভাবী ও তার বাচ্চা বসবাস করেন। এই বাসায় আসার পর জসিম উদ্দিন মাসুমকে দুধের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে অজ্ঞান করা হয়। অচেতন অবস্থায় দুই দিন থাকার পর মঙ্গলবার একটি কক্ষের বাথরুমে নিয়ে হত্যার পর লাশ ১১ টুকরা করা হয় জসিম উদ্দিন মাসুমকে। রুমার এক বন্ধুকে দিয়ে দুটি ব্যাগ নিয়ে আসার পর দুটি ব্যাগের ভিতরে সাত টুকরা রূপগঞ্জের একটি লেকের পাড়ে এবং অন্য চারটি অংশ ৩০০ ফিট এলাকায় একটি কাশবনে ফেলে দেয় রুমা। এরপর রুমার ভাষ্য মতে বৃহস্পতিবার রুমার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে কাশবন থেকে জসিম উদ্দিন মাসুমের দেহাংশের আরো চারটি টুকরা উদ্ধার করে পুলিশ। হাত, পা ও কোমর থেকে বুকের খণ্ডিত অংশ ছিল পরবর্তী উদ্ধার হওয়া দেহাংশের। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতি, ব্লেড বনানীর ২০ নম্বর সড়কের একটি বাসায় রেখে আসেন রুমা। পরে ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে চাপাতি, ব্লেড ও মাসুমের কিছু কাপড় চোপড় জব্দ করা হয়েছে। যার কিছুই তাদের এই ফ্ল্যাটের অন্যরা এমন লো্মহর্ষক বিষয়টি জানতেই পারে নাই।
একেক সময় একেক কথা বলছেন রুমা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রুমার ভাষ্য, শিল্পপতি মাসুমের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল দীর্ঘদিনের, পাশাপাশি মাসুম অন্য আরেক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। আরো এক নারীর সাথে এমন সম্পর্খ থাকায় জসিম উদ্দিন মাসুমের উপর রাগ-ক্ষোভ ও আবেগের বসে খুন করে রুমা।

সে দিন কী ঘটেছিল ?
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, রোববার (১০ নভেম্বর) বিকেলে মাসুম তার বাসা থেকে বের হয়ে গুলশান গিয়ে ব্যক্তিগত চালককে বাসায় ফিরে যেতে বলেন এবং মালেক নামে আরেক গাড়ির চালককে ডেকে নিয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জ আসবেন। মাসুমের মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ ও কোন কোনো খোঁজ না পেয়ে সোমবার গুলশান থানায় জিডি করেন বড় ছেলে ওবায়দুল ইসলাম শিবু।
এরপর বুধবার (১৩ নভেম্বর) সকালে রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন-কুড়িল বিশ্বরোড সড়কের লেকের পাড় থেকে তিনটি পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশের সাত টুকরা উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিনই জিডির সূত্র ধরে নিশ্চিত হওয়া যায় ওই লাশের টুকরা শিল্পপতি জসিম উদ্দিন মাসুমের।
শিল্পপতি জসিম উদ্দিন মাসুম গাড়িচালক আবদুল মালেক জানান, ‘নদী জলে শাপলা ভাসে’সহ দুটি সিনেমার প্রযোজক এই মাসুম। সিনেমা জগতে মিশতে গিয়ে অনেক নায়ক-নায়িকার সঙ্গে তার পরিচয়। এর সূত্র ধরে রুমা আক্তার নামে এক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয়। তার বাসা কাফরুল। এর আগেও কয়েকবার ওই বাসায় গেছেন শিল্পপতি। তার সন্ধান পেতে ঘটনার পর রুমার বাসায় গেলে তিনি জানান, রোববার বিকেলে সেখানে যান মাসুম। আধা ঘণ্টা পর বাসা থেকে চলে যান।
এরর পর পুলিশ শিল্পপতি জসিম উদ্দিন মাসুম হত্যাকান্ডের সকল তথ্য উদঘাটনের পর স্বীকারোক্তি প্রদান করতে ঘাতক রুমা ও তার বান্ধবী রোকসানা ওরফে রুকুকে আদালতে পাঠায়। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের পর ঘাতক রুমা ও তার বান্ধবী রোকসানা ওরফে রুকুকে কারাগারে পাঠানোর আদশ দেন বিজ্ঞ বিচারক ।









Discussion about this post