নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় শুল্ক ও কর ফাঁকি দিয়ে আনা বিপুল পরিমাণ ভারতীয় কসমেটিকস উদ্ধারের ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে দেশের চোরাচালান প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের অভিযানে প্রায় ২৯ লাখ টাকার নিষিদ্ধ পণ্য উদ্ধার হলেও, দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় শক্তিশালী চোরাকারবারি চক্র এবং তাদের কথিত পৃষ্ঠপোষকদের বিষয়ে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
কোস্ট গার্ডের অভিযান
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক জানান, শুক্রবার দিবাগত রাতে কোস্ট গার্ড স্টেশন পাগলার নেতৃত্বে ফতুল্লা বাজার সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে একটি সন্দেহজনক মিনি ট্রাক তল্লাশি করে শুল্ক ও কর ফাঁকি দিয়ে আনা বিপুল পরিমাণ ভারতীয় কসমেটিকস উদ্ধার করা হয়। এ সময় ট্রাকসহ দুইজন পাচারকারীকে আটক করা হয়। উদ্ধারকৃত পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ২৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।
কোস্ট গার্ড জানায়, জব্দ করা আলামত ও আটক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং চোরাচালান রোধে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
রমজান ও ঈদকেন্দ্রিক চোরাচালান
আর মাত্র এক মাস পর শুরু হবে পবিত্র রমজান। ঈদকে সামনে রেখে এই সময়েই নগরীর পোশাক ও কসমেটিকসের গুদামগুলোতে পণ্য মজুত শুরু হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিবছরই চোরাচালান চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লাভিত্তিক প্রায় ২৫ জনের একটি শক্তিশালী চোরাকারবারি চক্র দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানা পর্যায়ে সক্রিয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি ডিবি পুলিশ, ফাঁড়ি পুলিশ, সিআইডিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য ও তাদের কথিত ‘ক্যাশিয়ার’-এর মাধ্যমে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে কোটি কোটি টাকার ভারতীয় চোরাই পণ্য দেশীয় বাজারে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ফলে বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন এবং সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ধরা পড়ে কারা ?
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, চোরাচালান চক্রের সঙ্গে সমন্বয় বা ‘ম্যানেজ’ করতে না পারলেই মূলত ছোট বা বিচ্ছিন্ন পাচারকারীরা ধরা পড়ছে। আর বড় চক্রটি থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফতুল্লায় কোস্ট গার্ডের অভিযানে ২৯ লাখ টাকার নিষিদ্ধ পণ্য আটক হলেও, এর আগে ও পরে অন্যান্য সংস্থার পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো অভিযান চোখে পড়েনি।
নীরব অন্যান্য সংস্থা
গত কয়েক বছরে কোস্ট গার্ড একাধিকবার নিষিদ্ধ পণ্য উদ্ধার করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থাকে তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় দেখা গেছে। যাদের বিরুদ্ধে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা না নেওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোরাচালান প্রতিরোধে একক কোনো বাহিনীর সাফল্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত অভিযান, স্বচ্ছ তদন্ত এবং অভিযোগপ্রাপ্ত অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা। তা না হলে রমজান ও ঈদকেন্দ্রিক চোরাচালান আরও ভয়াবহ রূপ নেবে এবং বৈধ ব্যবসা ও রাষ্ট্রীয় রাজস্ব উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
উপসংহার
ফতুল্লায় কোস্ট গার্ডের সাম্প্রতিক অভিযান প্রমাণ করে, সদিচ্ছা থাকলে চোরাচালান দমন সম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো—এই সাফল্য কি একক উদাহরণ হয়েই থাকবে, নাকি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও নীরবতা ভেঙে মাঠে নামবে? জনস্বার্থে এ প্রশ্নের জবাব দ্রুতই প্রয়োজন।








Discussion about this post