প্রধান প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জ—বাংলাদেশের শিল্পনগরী, আবার একই সঙ্গে দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও রক্তাক্ত রাজনৈতিক অপরাধের এক নীরব সাক্ষী।
এই শহরের নাম উচ্চারণ করলেই আজও মানুষের মনে ভেসে ওঠে ২০১৪ সালের সেই চাঞ্চল্যকর সাত খুনের বিভীষিকা। রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনীতি ও অপরাধের ভয়াবহ যোগসাজশের প্রতীক হয়ে আছে সেই ঘটনা।
সেই সাত খুনের ঘটনায় যার নাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছিল, যার দিকে অভিযোগের অঙ্গুলি বারবার নির্দেশিত হয়েছিল—তিনি র্যাবের তৎকালীন প্রভাবশালী কর্মকর্তা, সাবেক ডিজি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান।
কিন্তু বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, বিচারপ্রক্রিয়ার দ্রুততা ও শাস্তির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির মধ্য দিয়েই সেই সময় তিনি কার্যত দায়মুক্তি পেয়ে যান।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কর্নেল তারেক সাঈদ—যিনি কনডেম সেলে বন্দী আওয়ামী লীগ নেতা মায়া চৌধুরীর মেয়ের জামাতা কর্ণেল (বহিস্কৃত) তারেক সাঈদ—নিজের স্বীকারোক্তিতে সাত খুনের নির্দেশদাতা হিসেবে জিয়াউল আহসানের নাম উল্লেখ করলেও, সে স্বীকারোক্তি কখনোই বিচারিক অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে আসেনি।
ফলে প্রশ্ন থেকেই গেছে—সাত খুনের বিচার কি পুরো সত্য উন্মোচন করেছিল, নাকি কিছু সত্য চাপা পড়েছিল ক্ষমতার ভারে ?
সেই প্রশ্ন আজ নতুন করে সামনে এসেছে। সাত খুনের মামলায় রক্ষা পাওয়া জিয়াউল আহসান এবার ধরা পড়েছেন ভিন্ন অপরাধে—দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে। আর সেই সূত্র ধরেই নারায়ণগঞ্জে তার সম্পত্তিতে প্রশাসনের সিলগালা যেন ইতিহাসের এক নির্মমতা।
আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার জলসিঁড়ি প্রজেক্টে অবস্থিত ‘জয়িতা’ নামের একটি ৮ তলা ভবনের একটি ফ্ল্যাট সিলগালা করে প্রশাসন। ভবনটি সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ও তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের নামে নিবন্ধিত।
সিলগালা কার্যক্রম পরিচালনা করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আরডিসি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহরিয়ার পারভেজ।
এটি নিছক একটি প্রশাসনিক অভিযান নয়; এটি রাষ্ট্রের বিবেকের সামনে দাঁড় করানো এক বড় প্রশ্ন—যে ব্যক্তি একসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে থেকে অন্যের যোগাযোগ নজরদারি করতেন, আজ তার নিজের সম্পদই নজরদারির আওতায়।
দুদকের মামলার নথি বলছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে জিয়াউল আহসান নিজ নামে প্রায় ২২ কোটি ২৭ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।
তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের নামে ১২০ কোটি টাকারও বেশি অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে।
আটটি সক্রিয় ব্যাংক হিসাবে বিপুল অর্থ ঘোরাফেরা করেছে, বিদেশি মুদ্রা লেনদেনের সীমা লঙ্ঘন করা হয়েছে, অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে।
আইন অনুযায়ী, একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা হয়েও তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দণ্ডবিধি, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন লঙ্ঘন করেছেন—এমন অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় গত বছরের ৭ জানুয়ারি।
এখানেই নারায়ণগঞ্জের প্রাসঙ্গিকতা আরও গভীর। কারণ এই শহর বারবার দেখেছে—ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে বছরের পর বছর ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান, আবার সময়ের ব্যবধানে কীভাবে সেই একই শহরই হয়ে ওঠে তাদের পতনের নীরব সাক্ষী।
প্রবাদ আছে—“ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, কিন্তু নড়ে।”
নারায়ণগঞ্জে জিয়াউল আহসানের সম্পত্তিতে সিলগালা সেই প্রবাদকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
তবে এটুকু স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—এটি যদি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন মামলা হয়ে থাকে, তবে ইতিহাস আবারও আমাদের ক্ষমা করবে না।
নারায়ণগঞ্জের মানুষ চায় না প্রতীকী শাস্তি; তারা চায় পূর্ণ সত্যের উন্মোচন। সাত খুন থেকে শুরু করে দুর্নীতির প্রতিটি অভিযোগ—সব কিছুর নিরপেক্ষ, ভয়হীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচার।
এই শহর অনেক রক্ত দেখেছে, অনেক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি শুনেছে। এখন সময় এসেছে, নারায়ণগঞ্জকে আর ক্ষমতার পরীক্ষাগার নয়, আইনের শাসনের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার।
কারণ বিচার যদি সত্যিই অন্ধ হয়, তবে সে কাউকে চিনবে না—না জেনারেল, না ডিজি, না ক্ষমতাবান কোনো ছায়া।









Discussion about this post