নিজস্ব প্রতিবেদক :
দীর্ঘদিন পর নারায়ণগঞ্জ র্যাব-১১-এর একটি সফল অভিযানে ভারতীয় চোরাচালান ও বিস্ফোরক পাচারের একটি বড় চালান আটক হওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাকারবারি সিন্ডিকেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা।
সোনারগাঁয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের আড়ালে পরিচালিত এই চোরাচালান শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বহু বছর ধরে চলে আসা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়, যার সঙ্গে ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতির অভিযোগও বারবার উঠে এসেছে।
দীর্ঘদিনের নীরবতা, হঠাৎ অভিযান
গত কয়েক বছরে থানা পুলিশ, ডিবি, হাইওয়ে পুলিশ, সিআইডিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ভারতীয় চোরাচালান সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অভিযান খুব একটা চোখে পড়েনি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর বিপরীতে কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান চালিয়ে একাধিকবার চোরাচালান চক্রকে ধাক্কা দিলেও স্থলভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
সমালোচকরা বলছেন, সীমান্ত থেকে রাজধানী পর্যন্ত চোরাচালান পণ্য নির্বিঘ্নে চলাচল করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় যদি না কোথাও না কোথাও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা কিংবা অসাধু যোগসাজশ থাকে।
‘ক্যাশিয়ার’ ও ম্যানেজ সংস্কৃতির অভিযোগ
বিভিন্ন সময় গণমাধ্যম ও স্থানীয় মহলে অভিযোগ উঠেছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের কিছু অসৎ চক্র, বিশেষ করে তথাকথিত “ক্যাশিয়ার” ব্যবস্থার মাধ্যমে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত ম্যানেজ করে ভারতীয় সিন্ডিকেটগুলো বাংলাদেশে অবৈধ পণ্যের রমরমা ব্যবসা চালিয়ে এসেছে। যদিও এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্ত খুব কম ক্ষেত্রেই হয়েছে, ফলে দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি থেকে গেছে অনুত্তরিত।
র্যাব-১১-এর অভিযান: আশার আলো, নাকি ব্যতিক্রম ?
২৮ জানুয়ারি ভোররাতে সোনারগাঁয়ের কেওডালা এলাকায় র্যাব-১১-এর অভিযানে ৯৬ হাজারের বেশি বিস্ফোরক ও আতশবাজি, বিপুল পরিমাণ চকলেট, কসমেটিকসসহ ১৩ ধরনের ভারতীয় পণ্য জব্দ এবং দুজনকে আটক করা হয়। আটকরা স্বীকার করেছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে আরও ১০–১২ জনের সঙ্গে মিলে কুরিয়ার সার্ভিসের আড়ালে শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে এসব পণ্য দেশে এনে বিক্রি করছিলেন।
এই স্বীকারোক্তি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে—দীর্ঘদিন ধরে এমন কার্যক্রম চললেও আগে কেন তা দৃশ্যমান অভিযানে আসেনি ?
প্রয়োজন কাঠামোগত জবাবদিহি
র্যাব-১১-এর এই অভিযান অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে এটি যদি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সাফল্য হয়ে থাকে, তাহলে চোরাচালান চক্রের মূল কাঠামো অক্ষতই থেকে যাবে। প্রয়োজন—
# আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের দুর্নীতি ও ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতির অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত
# নিয়মিত ও সমন্বিত অভিযান, যাতে কোনো সংস্থা দায় এড়াতে না পারে
# অভিযানে জড়িত নয়, বরং অবহেলায় সুযোগ করে দেওয়া কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা
# কুরিয়ার ও পরিবহন খাতের ওপর কার্যকর নজরদারি
উপসংহার
চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; বিস্ফোরক পাচারের মতো ঘটনা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। র্যাব-১১-এর সাম্প্রতিক অভিযান প্রমাণ করে—চাইলেই এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো, এটি কি নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে, নাকি আবারও নীরবতার সুযোগে ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে ?
জনস্বার্থে প্রয়োজন একটিই বিষয়—নির্বাচিত সাফল্য নয়, বরং ধারাবাহিক ও জবাবদিহিমূলক আইন প্রয়োগ।









Discussion about this post