প্রধান প্রতিবেদক :
২০১৬ সালের ১৩ মে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের সঙ্গে যা ঘটেছিল, তা শুধু একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত অপমান নয়—তা ছিল রাষ্ট্রের আইনি ও নৈতিক অবস্থানের এক নির্মম পরীক্ষা।
ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে প্রকাশ্যে কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনায় তৎকালীন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের ভূমিকা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের জন্ম দেয়।
নারায়ণগঞ্জ থেকে রাজধানী—সর্বত্রই উঠেছিল প্রশ্ন: আইনের ঊর্ধ্বে কি কেউ ?
পরদিন অসুস্থ শ্যামল কান্তি ভক্ত যখন খানপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তখন তাঁর সঙ্গে দেখা করে সহমর্মিতা জানিয়েছিলেন অনেকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন—ঘটনার কেন্দ্রীয় অভিযুক্ত সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বরং উল্টো চিত্র দেখা যায়। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধেই মামলা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই মামলার তদন্তও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ; এক বছর পর তাঁকে কারাগারেও পাঠানো হয়।
এখানেই শেষ নয়। ঘটনাটির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক ছিল—সে সময় নারায়ণগঞ্জে প্রভাবশালী কোনো হিন্দু নেতা বা সংগঠন প্রকাশ্যে শ্যামল কান্তির পাশে দাঁড়ায়নি। একটি বিবৃতিও আসেনি। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত অভিযোগ, তাদের অনেকেই ছিলেন ওসমান পরিবারের রাজনৈতিক বলয়ের অংশ। এক বছর পর কেন্দ্রীয় নির্দেশে দায়সারা একটি মানববন্ধনই ছিল ব্যতিক্রম—যা ন্যায়বিচারের চেয়ে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকেই স্পষ্ট করেছে।
দীর্ঘদিন পর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির ফেসবুক মন্তব্য নতুন করে সেই স্মৃতি ও ক্ষতকে সামনে এনেছে।
তাঁর বক্তব্য শুধু অতীতের একটি ঘটনার পুনরুল্লেখ নয়; বরং এটি বর্তমানের দিকে আঙুল তোলে।
কারণ অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, একাধিক মামলার কথা জনপরিসরে আলোচিত হলেও সেলিম ওসমান আজও দেশে অবস্থান করে নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করছেন—এমন বাস্তবতা জনমনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করছে।
প্রশ্নটা এখন আর শুধু শ্যামল কান্তি ভক্তকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটা রাষ্ট্রের কাছে—কেন প্রভাবশালীদের জন্য আইন বারবার নীরব থাকে? কেন তদন্ত, বিচার ও জবাবদিহি একটি নির্দিষ্ট বলয়ের কাছে এসে থেমে যায় ?
অভিযোগ থাকা মানেই দোষী সাব্যস্ত নয়—এটা সত্য। কিন্তু অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়াটাই তো ন্যূনতম গণতান্ত্রিক দায়।
শ্যামল কান্তি ভক্তের ঘটনা নারায়ণগঞ্জে ক্ষমতার অপব্যবহার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। আর সেলিম ওসমানের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান দায়বদ্ধতার অনুপস্থিতি সেই দৃষ্টান্তকে আরও গভীর করে। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি চলতে থাকলে, ভবিষ্যতে শ্যামল কান্তির মতো আরও অনেক নাম কেবল প্রতিবাদের পোস্টারেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে—বিচার থাকবে অধরাই।









Discussion about this post