নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা বক্তাবলী ইউনিয়ন আবারও চরম অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মুখে পড়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র হত্যা মামলাসহ মোট ২২টি মামলার আসামি, একাধিকবার কারাভোগকারী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপর হামলা-হুমকির অভিযোগে অভিযুক্ত আব্দুর রশিদ মেম্বারকে পুনরায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসী ও ইউনিয়ন পরিষদের অধিকাংশ সদস্যের তীব্র আপত্তি উপেক্ষা করে প্রশাসনের একটি অংশ তাকে পুনর্বহালের উদ্যোগ নিচ্ছে—এমন অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; বরং এর পেছনে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের গন্ধ রয়েছে। তাদের ভাষায়, “যে ব্যক্তি একাধিক মামলার আসামি এবং বারবার জেল খেটেছে, তাকে আবারও চেয়ারম্যান করার চেষ্টা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—কার স্বার্থে এই উদ্যোগ ?”
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন এমপি শামীম ওসমান এবং স্থানীয় চেয়ারম্যান শওকত আলীর ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে আব্দুর রশিদ মেম্বার এলাকায় একপ্রকার ভয়ভীতির রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। বিভিন্ন অনিয়ম, দখল-বাজি, হামলা-হুমকি এবং প্রভাব খাটিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই তার বিরুদ্ধে প্রচলিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দ্রুত অবস্থান বদলে বিএনপির ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। তবে রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও তার বিরুদ্ধে থাকা অপরাধের অভিযোগ কিংবা মামলার সংখ্যা কমেনি। বরং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলায় পলাতক থাকার পর তাকে র্যাব বরিশাল থেকে গ্রেফতার করে। দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলেও আবারও অন্য একটি মামলায় ফতুল্লা থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়।
বারবার কারাগারে যাওয়া-আসার পরও আব্দুর রশিদ মেম্বারের ক্ষমতায় ফেরার তৎপরতা থেমে থাকেনি। সম্প্রতি তিনি আবারও বক্তাবলী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদের একাধিক মেম্বার লিখিতভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আপত্তি জানিয়েছেন।
তাদের বক্তব্য, একজন বিতর্কিত ও বহু মামলার আসামিকে ইউনিয়নের সর্বোচ্চ দায়িত্বে বসানো হলে তা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়; বরং এটি পুরো ইউনিয়নের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেবে।
পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে প্রশাসন প্রথমে ইয়াসির আরাফাত রুবেলকে ছয় মাসের জন্য প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেয়। কিন্তু তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর হাইকোর্টের একটি রায়ের ব্যাখ্যা সামনে এনে আবারও আব্দুর রশিদ মেম্বারকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, হাইকোর্টের ওই রায়ে রশিদ মেম্বারকে সরাসরি চেয়ারম্যান করার কোনো নির্দেশনা বা রুল নেই। ফলে এত বিতর্ক ও অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে পুনর্বহাল করার উদ্যোগ প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তারা বলছেন, অধিকাংশ মেম্বার ও এলাকাবাসীর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মেম্বারের ভাষ্য-
“সবাই আপত্তি করছে, তবুও কেন তাকেই আবার চেয়ারম্যান বানাতে হবে ? নিশ্চয়ই এর পেছনে বড় ধরনের স্বার্থ বা আর্থিক লেনদেন রয়েছে ।”
এদিকে ক্ষমতায় না ফিরতেই আব্দুর রশিদ মেম্বারের বিরুদ্ধে নতুন করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি নারী মেম্বার হাসনা ভানুকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিয়ে লাশ গুম করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় হাসনা ভানু ফতুল্লা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং: ১৬৫৮, তারিখ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬) করেছেন।
এছাড়াও তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আরেক আসামি মহিউদ্দিন মেম্বার প্রকাশ্যে রাসেল মেম্বারকে লাথি মারার ঘটনাও এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, আব্দুর রশিদ মেম্বারকে যদি আবার চেয়ারম্যান করা হয়, তাহলে ইউনিয়ন পরিষদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হবে এবং মেম্বারদের ওপর হামলা-নির্যাতনের ঘটনা বাড়তে পারে। এতে বক্তাবলী ইউনিয়নের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটার ঝুঁকি রয়েছে।
বক্তাবলীবাসী এখন সরাসরি জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ দাবি করছেন। তাদের বক্তব্য, এত বিতর্কিত একজন ব্যক্তিকে দায়িত্বে বসানো হলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাদের দাবি—ইউনিয়ন পরিষদের বিধি অনুযায়ী মেম্বারদের ভোট বা সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন গ্রহণযোগ্য, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হোক।
অন্যথায় প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত বক্তাবলী ইউনিয়নকে নতুন করে সংঘাত, সহিংসতা ও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরছে।









Discussion about this post